হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজের ওপর হামলা জোরদার করেছে ইরান। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিজের প্রভাব পুনরুদ্ধার করতেই তেহরান এই হামলা চালাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে এখন পর্যন্ত এক ডজনেরও বেশি হামলা হয়েছে। এতে প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ কমে গেছে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের উপরে রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলার কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি রিপাবলিকান পার্টির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, "৩ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আমরা কোনো সময় ইরানে হামলা করব না।" তিনি আরও বলেন, প্রশাসন তেহরানের সঙ্গে "ফলপ্রসূ আলোচনা" চালিয়ে যাচ্ছে এবং তাঁর মূল লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা।
তবে তেহরান হরমুজকে "কৌশলগত লাল রেখা" হিসেবে বিবেচনা করছে এবং উপসাগরে তাদের লক্ষ্যবস্তুর পরিধি বাড়াচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও মার্কিন চাপ মোকাবিলা করতে হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য অপরিহার্য। অন্যদিকে ওয়াশিংটন বলেছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবাধ চলাচলের নীতি অলঙ্ঘনীয়। উপসাগরীয় দেশগুলিও এই অবস্থান সমর্থন করে, কারণ তাদের অধিকাংশ বাণিজ্য এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ন্যাশনাল গার্ড জানিয়েছে, একটি তেলবাহী জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের পর তারা ২২ জনকে উদ্ধার করেছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা ভারতের নাগরিক। ভারত অন্যতম বৃহত্তম নাবিক সরবরাহকারী দেশ।
জাহাজ চলাচলের ঘটনা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আরও কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটি জানায়, একটি বহির্গামী ট্যাংকারের মাস্টার জানিয়েছেন, শনিবার হরমুজ প্রণালীতে একটি অজ্ঞাত প্রক্ষেপণে জাহাজটি আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং এতে আগুন ধরে যায়। রোববার একই এলাকায় আরেকটি হামলার খবর দিয়েছে ইউকেএমটিও, যাতে জাহাজটির ক্ষতি হয়েছে। সব ক্রু নিরাপদ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী শনিবার দাবি করেছে, তেহরানের অনুমোদন ছাড়া হরমুজ প্রণালী থেকে বেরোনোর চেষ্টা করার সময় অপরিশোধিত তেলবাহী একটি সুপারট্যাংকার নৌমাইনে আঘাত লেগে বিশাল বিস্ফোরণের শিকার হয়েছে। আইআরজিসি প্রধান আহমেদ ভাহিদি এক্স পোস্টে লিখেছেন, "কোনো বহিরাগত শক্তির এই অঞ্চলে হুমকি দেওয়া, প্রভাব বিস্তার করা বা হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। হরমুজ প্রণালী ইরানের কৌশলগত লাল রেখা।"
ইউকেএমটিও রোববার জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জলসীমায় কয়েকটি জাহাজ থেকে রিপোর্ট পাওয়া গেছে যে ভিএইচএফ রেডিও বার্তার মাধ্যমে তাদের নোঙর থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইরান সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করা থেকে বিরত থেকেছে।
শিপিং বিশ্লেষক সংস্থা অ্যামব্রে জানিয়েছে, আইআরজিসি নৌবাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমাহ বন্দর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে নোঙর করা ছয়টি জাহাজকে সতর্কবার্তা দিয়েছে। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, "জাহাজগুলোকে নোঙর তুলে অবিলম্বে এলাকা ছেড়ে দুবাই অ্যাংকরেজে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।"
বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালী দিয়ে তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহনের পরিমাণ বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় ইরানি হামলা ও হুমকি বেড়েছে। সমুদ্র তথ্য ট্র্যাকিং সংস্থা কেপলারের মতে, সেপ্টেম্বরের শেষে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৩ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে দৈনিক ১৭ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেলের প্রায় ৮০ শতাংশের সামান্য কম।
তবে চলতি মাসে প্রবাহ কমে গেছে বলে মনে হচ্ছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার মাত্র সাতটি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হয়েছে, যা সাত দিনের গড়ের অর্ধেকেরও কম এবং ২৩ জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন। তবে শনাক্তকরণ এড়াতে অনেক জাহাজ তাদের আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম বন্ধ করে রাখায় পরিসংখ্যান কখনও কখনও সংশোধন করা হয়।
মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ অব্যাহত রেখেছে, যা ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার কৌশলের অংশ। শনিবার ওমান উপসাগরে একটি কার্গো জাহাজের ক্রু সতর্কতা উপেক্ষা করে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করলে মার্কিন সামরিক বাহিনী জাহাজটিকে অকার্যকর করে দেয়। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড এক্স পোস্টে জানিয়েছে, "মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি ফাইটার জেট পানামা পতাকাবাহী এম/ভি ওশান মোলিকা (অপর নাম আরিকা সান) জাহাজের পিছনে নির্ভুল গোলা নিক্ষেপ করে জাহাজটির প্রপালশন সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দেয়, তবে ক্রুদের কোনো ক্ষতি হয়নি।"
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন অবরোধ অত্যন্ত কার্যকর হয়েছে। কেপলার ২০১৩ সালে ইরানি রপ্তানি পর্যবেক্ষণ শুরু করার পর সেপ্টেম্বর ছিল প্রথম মাস যখন ইরান কোনো অপরিশোধিত তেল ট্যাংকারে বোঝাই করেনি।
গত সপ্তাহে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে দেশটির সম্মুখীন সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তেহরান জোর দিয়ে বলেছে, যদি তারা তাদের তেল রপ্তানি করতে না পারে, তবে তাদের প্রতিবেশীরাও পারবে না। মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতির সুযোগে তারা নিজেদের উদ্যোগ ধরে রেখেছে বলে মনে করে এবং তাদের সামরিক অবস্থান আক্রমণাত্মক দিকে এগিয়েছে বলে দাবি করেছে।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে বলেছিলেন, "আমেরিকান এবং অন্য দেশগুলোকে জানা উচিত: আমরা আগেই বলেছি, যে অঞ্চলে আমরা তেল বিক্রি করতে পারি না, সেখানে অন্য কেউও তেল বিক্রি করতে পারবে না। আর যদি আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তবে কোনো অবকাঠামো নিরাপদ থাকবে না।" এখন ইরান সেই হুমকি বাস্তবে রূপ দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে।