Deleted
প্রকাশ : Sep 27, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

১৯৭৫-পরবর্তী সংকটে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ঐতিহাসিক অধ্যায়

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অস্থির অধ্যায় হিসেবে নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন কর্তৃত্বের বৈধতা হারায় এবং জনগণের স্বার্থ ও আশা-আকাঙ্ক্ষা কার্যকর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন সমাজে বিভাজন, সংঘাত ও অস্থিরতা তীব্র হয়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন এই পরিস্থিতিকে 'প্রেটোরিয়ানিজম' ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলায় এর সরাসরি প্রতিশব্দ প্রচলিত না থাকলেও 'সামরিক হস্তক্ষেপপ্রবণ রাজনৈতিক পরিবেশ'কে এর ব্যবহারিক ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা যায়।

১৯৭৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে এই ধারণার আলোকে বিশ্লেষণ করলে তৎকালীন অস্থিরতার উপাদান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিদেশি গবেষক পিটার জে. বার্টোচি এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ও ড. মিজানুর রহমান শেলী তাঁদের আলোচনায় সে সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে 'প্রেটোরিয়ানিজম'-এর সম্পর্ক উল্লেখ করেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য, শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা ও জন-অসন্তোষ কোনো কিছুই এমন হত্যাকাণ্ডকে সমর্থনযোগ্য করে না।

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত কঠিন। অর্থনৈতিক সংকট, দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সরকারের বিতর্কিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ঘিরে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন সেই অস্থিরতা আরও গভীর করে। ফলে ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ প্রবেশ করে এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক অধ্যায়ে। রাষ্ট্রের সংকটময় সময়ে রাজনীতি ও সামরিক বাহিনীর সম্পর্কেও গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়। একের পর এক রাজনৈতিক পরিবর্তন, ক্ষমতার পালাবদল ও অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করছিল।

এমন পরিস্থিতিতে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্রমে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসেন। প্রথমে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা, উৎপাদন বাড়ানো, গ্রামীণ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে নতুন কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টির পাশাপাশি তিনি বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তাঁর সময়ে জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং স্বনির্ভরতার প্রশ্ন নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব লাভ করে।

জিয়াউর রহমানের শাসনামল বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়; তাঁর ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া, সামরিক হস্তক্ষেপ ও শাসনপদ্ধতি নিয়ে ইতিহাসে ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। তবু ১৯৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশের গভীর সংকটের প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের উত্থান ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়। সংকটের অন্ধকার সময়েই অনেক সময় একজন নেতার রাজনৈতিক ভূমিকার প্রকৃত তাৎপর্য দৃশ্যমান হয়। জিয়াউর রহমান যদি তখন অন্ধকারে নিমজ্জিত জাতির হাল না ধরতেন, তাহলে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই কঠিন হতো। তিনি প্রাণের ও চাকরির তোয়াক্কা না করে বুক চিতিয়ে সামনে দাঁড়িয়েছেন বারবার।

দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংকট যখন মানুষের মনে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে, তখন স্থিতিশীলতা ও কার্যকর কর্তৃত্বের আকাঙ্ক্ষা জোরালো হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল হলে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়। সামরিক রাজনীতির ক্ষেত্রে এই প্রপঞ্চটির প্রকাশ প্রত্যক্ষভাবে দেখা যায়। লেখক এডওয়ার্ড ফিট এমন পরিস্থিতিতে জনগণের প্রত্যাশিত স্বস্তিকে 'ওয়েলকাম রিলিফ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানকে একটি পরিবর্তন-প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে। এটি তৎকালীন অনিশ্চয়তা, সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করেছিল।

৭ নভেম্বরের ঘটনা আরও একটি কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। উপমহাদেশের ইতিহাসে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বৃহৎ সামরিক অভ্যুত্থানের স্মৃতি বহন করে। তার এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর, বাংলাদেশের সেনাসদস্যদের একাংশ আবারও ব্যতিক্রমধর্মী ভূমিকা পালন করেন। প্রচলিত সামরিক শৃঙ্খলার সীমা অতিক্রম করে তাঁরা যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন, পেশাদার সেনাবাহিনীর কাঠামোর বিচারে তা অস্বাভাবিক ছিল। তবে প্রয়োজন কখনো কখনো বৃহত্তর স্বার্থে ইতিবাচক অর্থেই নিয়মকে ছাপিয়ে যায়। পিটার জে. বার্টোচি-র আলোচনায় ঘটনাটিকে অভিহিত করা হয়েছে: 'Entirely a new story, a story never known or told before.'

জিয়াউর রহমান সেদিন যদি এগিয়ে না আসতেন, তাহলে হয়তো আমাদেরকে আবার সেই 'ইন্টারনাল কলোনিয়ালিজম'-এর শিকার হতে হতো। নিজের হাতে সমস্ত দায়িত্ব তুলে নিয়ে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন জাতির ত্রাতা হিসেবে। সামরিক একজন জেনারেল এভাবেই হয়েছিলেন গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা। জনগণ তাঁকে ভালোবেসেছে, বিশ্বাস করেছে এবং নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছে। সামরিক রাষ্ট্রপতি থেকে তাঁকে বেসামরিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল এদেশের সাধারণ জনগণই।

জনগণ ক্রমশ জিয়াউর রহমানের প্রতি তাদের আস্থার জায়গা সংহত করেছে। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে অনুষ্ঠিত গণভোটে আপামর জনসাধারণ উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ১৯ দফার পক্ষে ইতিবাচক ভোট প্রদান করেন। প্রেসিডেন্ট জিয়ার নীতি ও কর্মসূচির পক্ষে ৩ কোটি ৩০ লাখ ২১ হাজার ৬ শত ৮৪টি হাঁ ভোট পড়ে। জিয়ার নীতি ও কর্মপন্থার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের ফলে গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়।

আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে সেই ঐতিহাসিক গণভোটের দিনটির তাৎপর্য নতুন করে উপলব্ধি করা যায়। জাতীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে জনগণই যে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত উৎস -- সেদিনের গণভোট যেন তারই দৃশ্যমান সাক্ষ্য হয়ে উঠেছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়ার ১৯ দফা কর্মসূচির প্রতি বিপুল জনসমর্থন শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতি আস্থার প্রকাশ ছিল না; এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের উন্নয়ন-প্রচেষ্টায় জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের প্রত্যাশাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট জিয়ার সামনে ছিল দেশ ও জাতির অগ্রযাত্রার গুরুদায়িত্ব। ১৯ দফা কর্মসূচিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ, ধারাবাহিক প্রয়াস এবং সর্বোপরি জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা। আজকের দৃষ্টিতে ফিরে দেখলে বোঝা যায়, সেই গণভোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল সরকার ও জনগণের পারস্পরিক অংশীদারিত্বের ধারণা। জাতীয় উন্নয়ন যে সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রয়াসের ফল -- সেই উপলব্ধিই তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। ইতিহাসের পাতা উল্টালে তাই সেই গণভোট একটি বিশেষ সময়ের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও জনসম্পৃক্ততার স্মারক হিসেবে ধরা দেয়। এদেশে যতদিন গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে, ততদিনই বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক জিয়াউর রহমানের কাছে ফিরতে হবে সকলকে। তথাকথিত সামরিক শাসক তকমা দিয়ে এই জোয়ার রুদ্ধ করা যাবে না।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কুড়িগ্রামে মাদকের টাকা না দেওয়ায় ছেলের ছুরিকাঘাতে মা নিহত, ব

1

ফারজানা রুপার পক্ষে ট্রাইব্যুনালে লড়তে বার কাউন্সিলে ব্রিটিশ

2

প্রোগ্রামিং ছাড়াই অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ তৈরি, গুগল প্লেতে নতুন

3

চট্টগ্রামে হামে আক্রান্ত হয়ে স্কুলছাত্রীর মৃত্যু

4

ভোটার তালিকা সংশোধন চ্যালেঞ্জ: রাহুল গান্ধির আবেদনে নির্বাচন

5

সৌদিগামী ১০৩ ফ্লাইট ব্যাহত, ভোগান্তিতে ১৫ হাজার ৭৭৯ যাত্রী

6

সেমিকন্ডাক্টর খাতের বিকাশে টাস্কফোর্স গঠন, সদস্য ১৩ জন

7

১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্

8

সাখালিনে জাপানি সাংবাদিক গ্রেপ্তার, গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ

9

জন্মদিনের রাত ১২টার এসএমএসে আপ্লুত অপু বিশ্বাস

10

প্রাক্তনের প্রতি টান কাটতে গড়ে ৮ বছর লাগে: গবেষণা

11

ময়মনসিংহে স্কুলে মারামারি করা দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয়

12

আইসিসির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা 'অগ্রহণযোগ্য': নোবেল শান্তি প

13

৪৪ বছর পর সিঁড়ির ফাঁকে মিললো ১৯৮২ সালের চিঠি

14

শোরুম ইনচার্জ পদে জনবল নিয়োগ দেবে র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স

15

শরীয়তপুর সাংবাদিক সমিতির সভাপতি পলাশ, সম্পাদক মামুন

16

সৌদি জোটের হামলার জবাবে আরামকোতে হুথি হামলা, রাজধানীতে ক্ষেপ

17

ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে জানলেন তিনি ‘মৃত’

18

তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে প্যারাগুয়ে ও বেলিজের মন্ত্র

19

বিগ ব্যাশের নতুন মৌসুমে হোবার্ট হারিকেন্সে ফিরলেন রিশাদ হোসে

20