লেক কোমোর নীলাভ জলের সঙ্গে মিলিয়ে কোমো ১৯০৭ ক্লাবের জার্সির রংও নীল। স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে ক্লাবটির অন্য নাম ‘ই লারিয়ানি’ (লেক কোমোর বাসিন্দারা)। রূপক অর্থে, কোমোর খেলোয়াড়েরা সেই টলটলে জলরাশির বাসিন্দা।
গতকাল রাতে জিউসেপ্পে সিনিগাগলিয়া স্টেডিয়ামে চ্যাম্পিয়নস লিগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ৪–১ গোলে হারায় কোমো। এই ম্যাচে ২২ বছর বয়সী নিকো পাজের দুই গোলের সঙ্গে আরও এক গোল করানোই যেন বার্তা—ইউরোপ দেখো, পাজ কতটা উঠে এসেছেন!
পাজের উত্থান দৃশ্যমান, তবে মাঝমাঠে তাঁর খেলার গভীরতা কোন তলায় পৌঁছেছে তা আপাতত কেউ জানে না। যেমনটা ওই বয়সে কেউ জানত না লিওনেল মেসির ক্ষেত্রেও। দুজনেই আর্জেন্টাইন। অন্য ভাষায়, আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সির পূর্বসূরি ও উত্তরসূরি।
চলতি মাসে মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ ম্যাচ খেলার আগে থেকেই মোটামুটি ঠিক করা আছে, পাজই সেই জার্সির উত্তরসূরি। সেটা শুধু মেসির মতো পাজ বাঁ পায়ের ফুটবলার ও প্লেমেকার বলে নয়, আসল মিলটা গভীরতায়। সোনালি চুল বাদ দিলে ইউনাইটেডের বিপক্ষে নীল জার্সির পাজকে দেখে কখনো কখনো মনে হয়েছে, বুঝি মেসি খেলছেন!
মজার বিষয়, আর্জেন্টিনার জার্সিতেও আছে নীলের ছোঁয়া। মেসির উত্তরসূরি হিসেবে পাজ ১০ নম্বর জার্সিটি পেলে কেউ কেউ মজা করে বলতে পারেন, লেক কোমোর ১০ নম্বর বাসিন্দা এখন লেক আর্জেন্টিনারও ১০ নম্বর বাসিন্দা!
বেনিনের বিপক্ষে মেসির বিদায়ী ম্যাচে মেসির পাস থেকে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোলটি করেছিলেন পাজ। বক্সের বাইরে বল পেয়ে বাঁ পায়ের শটে গোলটি ছিল মেসির ক্যারিয়ারের প্রতিচ্ছবি। দুই সপ্তাহ পর ইউনাইটেডের বিপক্ষে ১ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডে করা পাজের গোলটিও যেন ‘কার্বন কপি’—মেসির মতোই বক্সের সামনে বা একটু ভেতর থেকে বাঁ পায়ের বাঁকানো শটে।
পরিসংখ্যানও জানাল আশ্চর্য মিল। চ্যাম্পিয়নস লিগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে গোল করা দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ দক্ষিণ আমেরিকান খেলোয়াড় এখন ২২ বছর ৪৪ দিন বয়সী পাজ। প্রথমজন ১৭ বছর আগে ২০০৯ ফাইনালে গোল করা ২১ বছর ৩৩৭ দিন বয়সী মেসি।
২০০৯ সালের সেই আসরেই এপ্রিলে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে ম্যাচে তিন গোলে অবদান ছিল মেসির। তারপর দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ আর্জেন্টাইন হিসেবে পাজও এক ম্যাচে অবদান রাখলেন তিন গোলে। তাই শুধু মেসির মতো শট নেওয়ার ভঙ্গি অনুকরণের জন্য নয়, ভাগ্যই যেন পাজকে টেনে নিচ্ছে মেসির পথে!
কিন্তু মেসি হওয়া সহজ নয়। বহু দম লাগে, লাগে অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা, প্রতিভা ও স্থায়িত্ব। ১৭ বছর বয়সের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনের মধ্যে তুলনা তাই অবান্তর। তবে মিলটাও অস্বীকার করা যায় না।
পাজ মেসির মতোই বাঁ পায়ের প্লেমেকার। ডান দিকে সরে খেলতে পছন্দ করেন। ইউনাইটেডের বিপক্ষে তাঁর টাচ ম্যাপেই রয়েছে প্রমাণ। প্রতিপক্ষের দুর্বলতা খুঁজতে পুরো মাঠে ঘুরে বেড়ানোর ক্ষেত্রেও তাঁর মধ্যে মেসির প্রতিচ্ছবি। ফ্রি-কিক নেওয়ার ভঙ্গি ও শটের বৈশিষ্ট্যেও তা-ই।
পার্থক্যও আছে। পাজের উচ্চতা ৬ ফুট ১ ইঞ্চি। লম্বা হওয়ায় শরীর সোজা রেখে ড্রিবলিং করতে হয় এবং সেটা গতির ওপর নির্ভরশীল। অনেকটাই কাকা কিংবা কেভিন ডি ব্রুইনার মতো। ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার মেসি নিচু সেন্টার অব গ্র্যাভিটির কারণে বিস্ফোরকগতিতেও শরীর ঝুঁকিয়ে ড্রিবলিং করতে পারেন। কিন্তু পরিপক্বতায় আবার মেসিকেই মনে করিয়ে দেন পাজ। অযথা বল ধরে রাখেন না। অথচ পেশাদার ফুটবলে মাত্র তিন বছর হলো তাঁর অভিষেক। কোমোর কোচ সেস্ক ফ্যাব্রেগাস অবশ্য বছরের শুরুতেই বলে রেখেছেন, ‘মনে হয়, সে এক দশক ধরে ফুটবল খেলছে।’
মেসির ভিডিও ইউটিউবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখার অভ্যাস আছে পাজের। কিন্তু মেসির মতো কথায় আর্জেন্টাইন টান নেই। স্পেনের তেনেরিফে জন্মানোয় ক্যানারিনিয়ান টান এখনো স্পষ্ট। আর্জেন্টাইন বাবা পাবলো পাজ জাতীয় দলের সাবেক ডিফেন্ডার। সেই প্রভাবে মজেই বেছে নেন আর্জেন্টিনার জার্সি। ১২ বছর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদের বয়সভিত্তিক দলে যোগ দেওয়ার সময় বাবার মতোই ছিলেন রক্ষণভাগের খেলোয়াড়। রিয়াল তাঁকে আক্রমণভাগে তুলে আনলেও রক্ষণের ফাঁক ধরে ফেলার ব্যাপারটি ভুলে যাননি।
রিয়ালে নিয়মিত হতে না পারায় দুই বছর আগে পাজ যোগ দেন কোমোয়। এর পর থেকে তাঁর হাত ধরে এগোচ্ছে ক্লাবটি। সমর্থকদেরও ভীষণ পছন্দের। কাল রাতে যেমন বদলি হয়ে মাঠ ছাড়ার সময় দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখিয়েছেন পাজকে। জাতীয় দল ও কোমো মিলিয়ে সর্বশেষ ১১ ম্যাচে ৭ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট করা কারও তো এমন সম্মানই প্রাপ্য।
পাজ নিজেও রাতটা ভুলতে পারবেন না। ম্যাচ শেষে স্কাই ইতালিয়াকে বলেন, ‘আমার ক্যারিয়ারে অন্যতম সুন্দর ম্যাচ। কখনো ভুলব না। এটা আমার স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু।’
আর মেসির মতো বাঁকানো শটের গোলটি নিয়ে? পাজের উত্তর, ‘ফাঁকা জায়গা দেখেই আমি শট নিই। পরিবারের সামনে এমন একটি রাত কাটাতে পেরে আমি আনন্দিত।’
আনন্দিত দর্শক থেকে সাংবাদিকেরাও। ম্যাচটি শেষেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সংবাদমাধ্যমে পাজের বন্দনা চলছে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির উত্তরসূরি—সেই বন্দনার শিরোনাম।