কলায় থাকা কয়েকটি পুষ্টি উপাদান ঘুমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। তবে শুধু কলা খেলেই ভালো ঘুম হবে, এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। সম্প্রতি এশিয়া প্যাসিফিক জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
কলায় থাকা ট্রিপটোফ্যান একটি অ্যামাইনো অ্যাসিড, যা শরীরে সেরোটোনিন ও মেলাটোনিন তৈরির প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। মেলাটোনিন ঘুম ও জেগে থাকার স্বাভাবিক চক্র নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে কলায় ট্রিপটোফ্যানের পরিমাণ খুব বেশি নয়।
ম্যাগনেশিয়াম স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পর্যাপ্ত ম্যাগনেশিয়াম শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করলেও কলা খেলে সরাসরি ঘুমের উন্নতি হবে—এমন প্রমাণ সীমিত।
পটাশিয়াম পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রমে সাহায্য করে এবং কলা পটাশিয়ামের একটি ভালো উৎস। তবে পটাশিয়ামসমৃদ্ধ কলা খাওয়ার সঙ্গে ভালো ঘুমের সরাসরি সম্পর্ক এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়।
ভিটামিন বি৬ শরীরে ট্রিপটোফ্যান থেকে সেরোটোনিন তৈরির প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। এছাড়া কলায় থাকা কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবার রাতে ক্ষুধা লাগলে হালকা নাশতা হিসেবে কাজ করে। কার্বোহাইড্রেট শক্তি জোগায় এবং ফাইবার পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, ফলে ক্ষুধার কারণে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা কিছুটা কমতে পারে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত ওই গবেষণায় অনিদ্রায় ভোগা ২১ জন অংশ নেন। তাঁদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়—একটি দল ঘুমানোর আগে কলা খেয়েছে, অন্য দল দুধ খেয়েছে এবং তৃতীয় দল স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস বজায় রেখেছে। ছয় সপ্তাহ পর কলা ও দুধ খাওয়া দুই দলের অংশগ্রহণকারীরা জানান, তাঁদের ঘুমের মান আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। গবেষণায় ঘুমের মান যাচাইয়ের প্রশ্নমালার পাশাপাশি বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমেও অংশগ্রহণকারীদের ঘুম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। তবে কলা খাওয়া দলের মোট ঘুমের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, এমন ফল পাওয়া যায়নি।
গবেষণাটির সীমাবদ্ধতাও আছে। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২১ এবং কে কোন দলে থাকবেন, তা দৈবচয়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়নি। তাই শুধু এই গবেষণার ভিত্তিতে কলা খেলে ভালো ঘুম হয় বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
রাতে ক্ষুধা লাগলে একটি ছোট বা মাঝারি আকারের কলা খেতে পারেন। চাইলে ঘুমানোর এক থেকে দুই ঘণ্টা আগেও খাওয়া যায়। তবে ঘুমের জন্য এ সময়টিতেই কলা খেলে সবচেয়ে বেশি উপকার মেলে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ঘুমানোর ঠিক আগে বেশি খাবার খেলে কারও কারও অস্বস্তি হতে পারে, তাই নিজের হজমের সুবিধা অনুযায়ী সময় বেছে নেওয়াই ভালো।
শুধু রাতে কলা খাওয়ার কারণে ওজন বাড়ে না। ওজন বাড়া বা কমা মূলত দীর্ঘ সময় ধরে শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় কতটা ক্যালরি গ্রহণ করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে। একটি মাঝারি আকারের কলায় প্রায় ১০৫ ক্যালরি, ২৭ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট ও ৩ গ্রাম ফাইবার থাকে। তবে কলার আকার ও জাতভেদে পুষ্টিমান কিছুটা আলাদা হতে পারে।
দিনের অন্য সময়ের মতো রাতেও পরিমিত পরিমাণে কলা খাওয়া যায়। রাতের খাবারের পর মিষ্টিজাতীয় খাবারের বিকল্প হিসেবেও একটি কলা বেছে নিতে পারেন। কলা পুষ্টিকর ফল, রাতে ক্ষুধা লাগলে হালকা নাশতা হিসেবেও খাওয়া যায়। তবে ভালো ঘুমের জন্য শুধু খাবারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না।
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন। শোবার ঘর শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখুন। বিকেল বা সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন। ঘুমানোর অন্তত আধা ঘণ্টা আগে মুঠোফোন ও কম্পিউটারের ব্যবহার বন্ধ রাখার চেষ্টা করুন। নিয়মিত ঘুমের সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। মনে রাখবেন, কলা স্বাস্থ্যকর খাবার হতে পারে; কিন্তু ঘুমের ওষুধ কিংবা অনিদ্রার চিকিৎসার বিকল্প নয়।