দামে কম, আলোও বেশ উজ্জ্বল—তাই কেনার আগে খুব বেশি ভাবতে হয় না। দোকানে সাজানো নাম না–জানা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এলইডি বাল্বের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহের অন্যতম কারণ এই কম দাম। কিন্তু যে বাল্বের আলোয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনা, কাজ কিংবা দৈনন্দিন জীবন চলছে, তার মান যাচাই না করেই ব্যবহার করছেন অনেক ক্রেতা। পণ্যের গায়ে লেখা তথ্য, প্রয়োজনীয় সনদ কিংবা আলোর গুণগত মান পরীক্ষা না করেই অনেক ক্ষেত্রে কেনা হচ্ছে এসব বাল্ব।
রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাজার—নানা প্রান্তে কম দামের বাল্বের চাহিদা রয়েছে। আকর্ষণীয় প্রচারণা ও উজ্জ্বল আলো দেখে ক্রেতারা পণ্য বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু বাল্বের দাম কম হলেই সেটি সাশ্রয়ী হয় না। এর স্থায়িত্ব, বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতা এবং আলোর মানও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
আলো উজ্জ্বল হলেই কি চোখের জন্য ভালো—এমন প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি বাল্বের আলো চোখের জন্য কতটা আরামদায়ক, তা শুধু উজ্জ্বলতার ওপর নির্ভর করে না। আলোর স্থিতিশীলতা ও রঙের বৈশিষ্ট্যও গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নমানের ড্রাইভার–সার্কিটের কারণে কিছু এলইডি বাল্বে দেখা দিতে পারে ‘ফ্লিকারিং’। অর্থাৎ, আলো খুব দ্রুত ওঠানামা করে। এই ওঠানামা অনেক সময় খালি চোখে স্পষ্ট বোঝা যায় না।
এ ধরনের আলোর সংস্পর্শে দীর্ঘ সময় কাজ বা পড়াশোনা করলে কারও কারও চোখে চাপ, অস্বস্তি কিংবা মাথাব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে এসব উপসর্গের পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। তাই আলোর মান যাচাই করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ আই হসপিটালের চক্ষুবিশেষজ্ঞ ডা. আশরাফুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছু নিম্নমানের বা মান যাচাই না করা এলইডি লাইটে নীল আলোর আধিক্য কিংবা আলোর ওঠানামার সমস্যা থাকতে পারে। দীর্ঘ সময় এমন আলোয় কাজ করলে চোখে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।’
আশরাফুল হক আরও বলেন, ‘ফ্লিকারিংয়ের কারণে কারও মাথাব্যথা, চোখে চাপ অনুভূত হওয়া কিংবা চোখ ভারী লাগতে পারে। কিছুক্ষণ কাজ করার পর আর স্বস্তি না পাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। আবার আলোর তীব্রতা প্রয়োজনের তুলনায় কম বা বেশি হলেও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।’
তাই বাল্ব কেনার সময় শুধু আলো কতটা উজ্জ্বল, তা দেখলেই হবে না; আলোর মান এবং পণ্যটি নির্ধারিত মান পূরণ করছে কি না, সেদিকেও নজর দিতে হবে বলে জানান তিনি।
কোন বাল্ব মানসম্মত, তা বুঝবেন কীভাবে? এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) সিএম বা সার্টিফিকেশন মার্ক লাইসেন্সের তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। বাধ্যতামূলক মানসনদের আওতাভুক্ত এলইডি লাইট কেনার সময় প্যাকেটে সিএম লাইসেন্স নম্বর আছে কি না, সেটি দেখতে হবে। পাশাপাশি পণ্যের ওয়াটেজ ও লুমেনের তথ্য যাচাই করা উচিত। ওয়াটেজ থেকে বাল্বের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধারণা পাওয়া যায়, আর লুমেন দিয়ে বোঝা যায় বাল্বটি কতটা আলো দিচ্ছে। তবে এসব তথ্যের উপস্থিতিই পণ্যটি মানসম্মত হওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, সনদের বৈধতাও নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত প্রযোজ্য মানসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, এলইডি লুমিনেয়ারের ক্ষেত্রে বিডিএস আইইসি ৬২৭২২-২-১:২০২৫ এবং বিডিএস ২০৫৩:২০২৫ মানের উল্লেখ রয়েছে। বাজারে পরিচিত ব্র্যান্ডের পণ্য বেছে নেওয়া ও নির্ভরযোগ্য বিক্রেতার কাছ থেকে কেনা ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
এলইডি লাইটের মান যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিএসটিআইয়ের পরিচালক (পদার্থ) প্রকৌশলী মুবিন উল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এলইডি লাইট বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক পণ্যের তালিকার অন্তর্ভুক্ত। কোনো প্রস্তুতকারক বা আমদানিকারক লাইসেন্স কিংবা ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। দেশীয় পণ্যের ক্ষেত্রে কারখানা পরিদর্শন করে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে বন্দর থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়।’
মুবিন উল ইসলাম আরও বলেন, এলইডি লাইট কত বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, কতটা আলো দিচ্ছে এবং সেই আলোর সহনীয়তা কেমন—এসব বিষয় নির্ধারিত মান অনুযায়ী যাচাই করা হয়। এর মধ্যে কালার রেন্ডারিং ইনডেক্স (সিআরআই) ও কালার টেম্পারেচারের মতো বিষয়ও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মানের শর্তগুলো পণ্যটি পূরণ করছে কি না, পরীক্ষার মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা হয়।
অর্থাৎ, একটি এলইডি বাল্বের মান যাচাই কেবল সেটি জ্বলছে কি না কিংবা আলো বেশি দিচ্ছে কি না, তা দেখার বিষয় নয়। বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতা, আলোর পরিমাণ ও গুণগত বৈশিষ্ট্যও নির্ধারিত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। তাই শুধু পণ্যের গায়ে বিএসটিআইয়ের নাম বা চিহ্ন দেখেই নিশ্চিন্ত হওয়া ঠিক নয়। লাইসেন্স নম্বর ও প্রযোজ্য সনদের বৈধতা যাচাই করা জরুরি। প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকলে বিক্রেতার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা যাচাই করা যেতে পারে।
একটি বাল্ব কেনার সময় সামান্য কিছু টাকা বাঁচানোই একমাত্র বিবেচনা হলে পণ্যের স্থায়িত্ব, বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতা ও আলোর গুণগত মানের মতো বিষয় আড়ালে পড়ে যেতে পারে। অথচ প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ব্যবহৃত এই পণ্যের ক্ষেত্রে কেনার আগের সামান্য সতর্কতাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এলইডি বাল্ব কেনার সময় শুধু দাম ও উজ্জ্বলতা নয়, ওয়াটেজ, লুমেন, সিএম লাইসেন্স নম্বর এবং প্রযোজ্য মানসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। আলোতে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর চোখে অস্বস্তি, মাথাব্যথা কিংবা ঝাপসা দেখার সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি।