দাবানলের কারণে বন্দী থাকার পর বোর্নিওর জঙ্গলে আটটি ওরাংগুটানকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার দ্বীপের পশ্চিমাঞ্চলের একটি সংরক্ষিত অরণ্যে তিনটি মা, তাদের তিনটি সন্তান এবং দুটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ ওরাংগুটানকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ইন্টারন্যাশনাল অ্যানিমেল রেসকিউ ইন্দোনেশিয়া (ইয়ারি) এবং বন মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।
গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ দাবানল থেকে ৪৬টি ওরাংগুটানকে উদ্ধার করেছিল। দেশটির শুষ্ক মৌসুমে দাবানল সাধারণ ঘটনা হলেও এ বছর তা আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
এই প্রাণীটি বর্তমানে চরমভাবে বিপন্ন। সংরক্ষণ সংস্থা ডব্লিউডব্লিউএফের তথ্য অনুযায়ী, এক শতাব্দী আগে বোর্নিও ও সুমাত্রায় দুই লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি ওরাংগুটান ছিল, যা এখন কমে প্রায় এক লাখ চার হাজারে দাঁড়িয়েছে।
ইন্দোনেশিয়াসহ অনেক দেশেই প্রতি গ্রীষ্মে দাবানল দেখা দেয়, তবে এল নিনো সমুদ্র উষ্ণায়ন ঘটনার কারণে এ বছরের দাবানল আরও ভয়াবহ ছিল। এই ঘটনা আবহাওয়ার ধরনকে আরও অস্থির ও তীব্র করে তোলে।
ইয়ারির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কারমেলে লিয়ানো সানচেজ বলেন, ওরাংগুটানদের আবাসস্থল অনিরাপদ হয়ে পড়ায় তাদের সংরক্ষিত অরণ্যে স্থানান্তর একটি ‘অপরিহার্য পদক্ষেপ’ ছিল।
মুক্তি পাওয়া ওরাংগুটানদের মধ্যে ছিল মা নোপি এবং তার সন্তান নোপি, নাউফাল ও নোপান। সেপ্টেম্বরের শুরুতে উদ্ধারের আগে তারা একটি নারকেল ও রাবার বাগানে বেঁচে ছিল। দাবানলে আশপাশের বনভূমি পুড়ে যাওয়ায় তাদের খাদ্যের উৎস সংকুচিত হয় এবং তারা মানুষের আরও কাছে চলে আসে।
মা লিফা ও তার সন্তান লিফাকে সম্পূর্ণভাবে তেলের পাম বাগানে ঘেরা এক টুকরো আকাশিয়া গাছের জায়গায় পাওয়া যায়। দাবানলে তাদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং খাদ্যের অভাবের কারণে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তাদের উদ্ধার করা হয়।
মা ম্যান ও তার শিশু ম্যানকে জুন মাস থেকে প্রাণী উদ্ধারকারীরা পর্যবেক্ষণ করছিলেন, যখন তাদের একটি ছোট বনভূমির পাশে বাগান এলাকায় পাওয়া যায়। দাবানল সেই স্থানের কাছে ছড়িয়ে পড়ায় তাদের বিচরণক্ষেত্র আরও সংকুচিত হয় এবং অন্য বনাঞ্চলে যাওয়ার নিরাপদ পথ বন্ধ হয়ে যায়। আগুনের সংস্পর্শে আসার আশঙ্কায় সেপ্টেম্বরের শুরুতে তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়।
যে সংরক্ষিত অরণ্যে ওরাংগুটানদের ছাড়া হয়েছে সেখানে খাদ্য ও পানি পাওয়া যায় এবং এটি অন্য বনাঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত। ইয়ারির আরগিতো রানতিং বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে উদ্ধার করা ওরাংগুটানদের কেবল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানো না হয়, বরং তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে বেঁচে থাকার প্রকৃত সুযোগ দেওয়া হয়।’
গত মাসে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার সতর্ক করে দেয় যে, বোর্নিওর ৫২ শতাংশ ওরাংগুটানের আবাসস্থলে দাবানল জ্বলছে। তারা জানায়, জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান গতিতে চলতে থাকলে এই প্রাণীর বিশাল অংশের আবাসস্থল তাদের জন্য বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
এ বছরের এল নিনো রেকর্ড পরিমাণ শক্তিশালী হয়েছে এবং আগামী বছরেও এর জলবায়ু প্রভাব থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা ইন্দোনেশিয়ায় দাবানল ছড়িয়ে পড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে বাগান তৈরির জন্য ভূমি পরিষ্কার করার প্রথার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে আগুন-প্রতিরোধী বন কম ঘনত্ব ও ছায়াযুক্ত গাছপালা দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে।
ইয়ারি জানায়, ওরাংগুটানদের মূল আবাসস্থল পুড়ে ও খণ্ডিত হয়ে পড়ায় সেখানে তারা আর টিকতে পারছিল না, এটাই তাদের স্থানান্তরের প্রধান কারণ ছিল।