১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'রকি' সিনেমার মধ্য দিয়ে পর্দায় আসে এক সংগ্রামী বক্সারের গল্প, যার সঙ্গে বাস্তব জীবনের অভিনেতা-লেখক সিলভেস্টার স্ট্যালোনের জীবনী আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। ৫০ বছর পর সেই সিনেমার নায়ক স্ট্যালোনের বয়স এখন ৮০। পেছনে তাকালে দেখা যায়, 'রকি' শুধু তাঁর ক্যারিয়ারই বদলে দেয়নি, বরং তাঁর নিজের জীবনকে বুঝে নেওয়ার এক আয়নাও হয়ে উঠেছে।
শৈশবের প্রত্যাখ্যান, দারিদ্র্য, অডিশনের পর অডিশন, নিজের লেখা গল্প বিক্রি না করে নিজেই নায়ক হওয়ার জেদ, 'রকি'র অস্কারজয়, 'র্যাম্বো'র জনপ্রিয়তা, শরীরের ওপর চরম পরীক্ষা, পারিবারিক সংকট, সন্তানের মৃত্যু, আবার উঠে দাঁড়ানো—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন নিজেই যেন একটি দীর্ঘ স্পোর্টস ড্রামা। 'রকি'র ৫০ বছর পূর্তি আর স্ট্যালোনের ৮০তম জন্মবর্ষে প্রকাশিত স্মৃতিকথা 'দ্য স্টেপস' সেই আয়নাটাকেই আরও কাছে টেনে এনেছে।
বইটি লিখতে গিয়ে তিনি ফিরে গেছেন দারিদ্র্য, প্রত্যাখ্যান, পারিবারিক ক্ষত, সন্তানের মৃত্যু, তারকা হওয়ার চাপ, শরীরের ওপর নির্যাতন—সবকিছুর কাছে। আর বারবার ফিরে এসেছেন সেই একটি চরিত্রের কাছে, যে তাঁকে পৃথিবীর কাছে পরিচিত করেছিল। স্ট্যালোনের ভাষায়, 'রকি' তাঁর জীবনে এক 'সুনামির মতো সৌভাগ্য' এনে দিয়েছে।
তিনি বলেন, এত বছর পরও তরুণেরা যখন ছবিটি দেখেন, তাঁরা ৮০ বছরের স্ট্যালোনকে নন, রকি বালবোয়ার সঙ্গে নিজেদের মিল খোঁজেন। তাঁর মতে, চরিত্রটি এমন কিছু স্পর্শ করেছিল, যার পুরো কৃতিত্ব তিনি নিজে নিতে পারেন না।
২৯ বছরের সেই মরিয়া মানুষটিআজকের স্ট্যালোনকে দেখলে ১৯৭০-এর দশকের সেই মানুষের কথা কল্পনা করা কঠিন। তখন তিনি হলিউডের তারকা নন, প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা তো বটেই না। নিউইয়র্কে কাজের আশায় ঘুরছেন, অডিশন দিচ্ছেন, স্ক্রিপ্ট লিখছেন। কখনো ডেলিতে, কখনো সিনেমা হলে কাজ করেছেন। টাকার অভাবে জানালার ধারে কটেজ চিজ রেখে খেতেন; কারণ, তাঁর ফ্রিজ কেনার সামর্থ্য ছিল না। এমনকি একসময় প্রিয় কুকুর বাটকাসকেও বিক্রি করে দিতে হয়েছিল।
'দ্য স্টেপস'-এ স্ট্যালোন লিখেছেন, সুযোগ না থাকলেও তিনি 'প্ল্যান বি' ভাবেননি। কারণ, তাঁর সামনে অন্য কোনো পথ ছিল না। তখন বয়স মাত্র ২৯। ক্যারিয়ার প্রায় থমকে গেছে। এমন সময় একটি বক্সিং ম্যাচ তাঁর ভেতরে গল্পের বীজ বুনে দেয়। ১৯৭৫ সালে মোহাম্মদ আলী ও চাক ওয়েপনারের লড়াই তাঁকে নাড়া দিয়েছিল। তবে নিজের স্মৃতিকথায় স্ট্যালোন রকির চরিত্রের অনুপ্রেরণা হিসেবে রকি মার্সিয়ানোসহ নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন।
স্ট্যালোন লিখলেন এক সাধারণ বক্সারের গল্প—যাঁর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা নেই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত লড়াই করার সুযোগটুকু পান। চিত্রনাট্য লেখা শেষ হওয়ার পর হলিউড সেটি পছন্দ করল। কিন্তু একটি শর্তে স্ট্যালোনকে ছবিতে অভিনয় করতে দেওয়া হবে না। তখনকার হিসাবে তাঁর জন্য প্রস্তাবিত অর্থ ছিল বিপুল। কিন্তু তিনি রাজি হননি। কারণ, তাঁর বিশ্বাস ছিল, রকি বালবোয়া শুধু তাঁর লেখা চরিত্র নয়; চরিত্রটির ভেতরে তাঁর নিজের জীবনও আছে। শেষ পর্যন্ত নিজের শর্তে তিনি ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় সবকিছু।
১৯৭৬ সালে মুক্তির পর 'রকি' হয়ে ওঠে বছরের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমাগুলোর একটি। অস্কারে ১০টি মনোনয়ন পায়; সেরা ছবি, সেরা পরিচালক ও সেরা সম্পাদনা—তিনটি পুরস্কার জেতে। একই বছর সেরা ছবির দৌড়ে এর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল 'ট্যাক্সি ড্রাইভার', 'অল দ্য প্রেসিডেন্টস মেন'-এর মতো সিনেমা।
স্ট্যালোনের কাছে অবশ্য অস্কারজয়ী গল্পের সবচেয়ে বড় অংশ নয়। বড় ব্যাপার হলো একজন মানুষ, যাঁকে কেউ গুরুত্ব দিতে চাইছিলেন না, নিজের গল্প লিখে সেই গল্পের নায়ক হওয়ার অধিকারটুকু আদায় করে নিয়েছিলেন। এখানেই রকি আর স্ট্যালোনের গল্প এক হয়ে যায়। রকি ছিলেন এমন একজন, যে জীবনে খুব বেশি কিছু পাননি। স্ট্যালোনও পাননি। রকি নিজের শরীর দিয়ে লড়াই করেছিল। স্ট্যালোন লড়েছিলেন প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে।
রকি চেয়েছিল অন্তত শেষ ঘণ্টা পর্যন্ত টিকে থাকতে। স্ট্যালোন চেয়েছিলেন অন্তত একবার নিজের মতো করে পর্দায় দাঁড়াতে। পার্থক্য শুধু এটুকু—রকি ছিল কল্পিত। স্ট্যালোনের লড়াই ছিল বাস্তব। চরিত্রটি পাঁচ দশক পরও যে বেঁচে আছে, সম্ভবত এটাই সবচেয়ে বড় কারণ।
স্ট্যালোন এখন ৮০। 'রকি', 'র্যাম্বো' ও 'দ্য এক্সপেন্ডেবলস'-এর মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি তাঁকে হলিউডের অন্যতম সফল তারকায় পরিণত করেছে। তাই আজও নিজেকে 'আন্ডারডগ' বলা নিয়ে তাঁর আপত্তি আছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মজা করে তিনি বলেছেন, বিলাসবহুল হোটেলের ওপরের তলায় বসে নিজেকে আন্ডারডগ বলা ভণ্ডামি হবে। তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি এখন 'লাকি ডগ'-ভাগ্যবান মানুষ।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এত সাফল্যের পরও তাঁর ভেতরের অনিরাপত্তা পুরোপুরি যায়নি। 'দ্য স্টেপস' লিখতে গিয়ে তিনি বুঝেছেন, জীবনের বড় একটা সময় তিনি নিজের কষ্টগুলো চাপা দিয়ে রেখেছিলেন। নিজের অতীত খুঁড়ে দেখার অভিজ্ঞতাকে তিনি তুলনা করেছেন হারিয়ে যাওয়া কোনো শহরের প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের সঙ্গে। তিনি যেন নিজেরই স্মৃতির 'আধ্যাত্মিক প্রত্নতাত্ত্বিক' হয়ে উঠেছিলেন।
স্ট্যালোনের উপলব্ধি—'এই অনিরাপত্তাই হয়তো তাঁকে এত দূর নিয়ে এসেছে।' আজও সংলাপ মুখস্থ করার জন্য শুটিং শুরুর এক মাস আগে ভোর পাঁচটায় উঠে পড়েন তিনি। এত সাফল্যের পরও কেন? তাঁর ধারণা, এর পেছনেও সেই অনিরাপত্তা কাজ করে।
স্ট্যালোনের শৈশব ছিল কঠিন। জন্মের সময় মুখের একটি স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাঁর ঠোঁটের একপাশ বেঁকে যায় এবং কথায় তৈরি হয় বিশেষ ধরনের জড়তা। ছোটবেলায় একের পর এক স্কুল বদলেছেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সের মধ্যে ১২টি স্কুলে পড়েছেন। কৈশোরে তাঁকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছিল, যেখানে তিনি ভয়াবহ নির্যাতনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।
এই স্মৃতিগুলোই 'দ্য স্টেপস' লেখার সময় আবার সামনে আসে। তিনি বলেছেন, মানুষ বেঁচে থাকার জন্য অনেক স্মৃতি চাপা দিয়ে রাখে। পরে সেগুলো যেন ক্ষত হয়ে শুকিয়ে যায়; কিন্তু একসময় ধুলো সরালে বোঝা যায়, ক্ষতটা আসলে সেখানেই ছিল।
সবচেয়ে বেশি কষ্টের জায়গাটি তাঁর মা–বাবাকে ঘিরে। মা জ্যাকি স্ট্যালোন ছিলেন অদ্ভুত ও বহুমুখী চরিত্রের মানুষ—জ্যোতিষী, পামিস্ট, এমনকি নানা ধরনের অভিনব পেশার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ছেলে হিসেবে স্ট্যালোনের মনে হয়েছে, মা তাঁকে প্রয়োজনীয় ভালোবাসা দেননি। তাঁর ভাষায়, কিছু মানুষ হয়তো সন্তান নেওয়ার জন্য তৈরি থাকেন না।
২০২০ সালে ৯৮ বছর বয়সে জ্যাকি মারা যান। খবরটি পাওয়ার সময় স্ট্যালোন গলফ খেলছিলেন। তিনি মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও যাননি। ঘটনাটি যতটা চমকপ্রদ, তার পেছনের সম্পর্কটি ছিল ততটাই জটিল। তবু স্ট্যালোন মনে করেন, তাঁর জীবনের এই অভাবগুলোই হয়তো সৃষ্টিশীল হওয়ার তাগিদ বাড়িয়েছে। তাঁর উপলব্ধি—যাদের জীবনে অনেক অমীমাংসিত ক্ষত থাকে, তাঁদের কেউ কেউ সেই কষ্টকে সৃষ্টির শক্তিতে পরিণত করেন।
স্ট্যালোনের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত আঘাতগুলোর একটি আসে ২০১২ সালে। তাঁর বড় ছেলে সেজ স্ট্যালোন মাত্র ৩৬ বছর বয়সে হৃদ্রোগে মারা যান। খবরটি পাওয়ার মুহূর্তটিও তাঁর মনে গেঁথে আছে। তিনি তখন নিজের অফিসে চিত্রনাট্য লিখছিলেন। ফোনে তাঁকে জানানো হয়, সেজ আর নেই।
বাবা-ছেলের সম্পর্কও সব সময় সহজ ছিল না। ১৯৯০ সালের 'রকি ৫'-এ সেজ তাঁর বাবার ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সিনেমার একটি দৃশ্যে বাবার বিরুদ্ধে জমে থাকা অভিযোগ উচ্চারণ করতে হয়েছিল তাঁকে। পরে সেজ জানিয়েছিলেন, সেই দৃশ্যের সংলাপের অনেকটাই তাঁর নিজের বাস্তব অনুভূতির সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। অভিনয়ের সময় বাবা-ছেলের দুজনেরই কান্না এসেছিল। সেই কাজের পর তাঁদের সম্পর্ক বদলে যায়।
কিন্তু ২০১২-এর মৃত্যু সেই সম্পর্ককে আবার শোকের জায়গায় নিয়ে যায়। স্ট্যালোন এখন বলেন, বহু বছরের চাপা কষ্ট একসময় বিস্ফোরণের মতো বেরিয়ে আসে। এই জমে থাকা শোক তাঁর দাম্পত্য জীবনেও বড় সংকট তৈরি করেছিল। ২০২২ সালে স্ত্রী জেনিফার ফ্ল্যাভিন বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ পর তাঁরা আবার একসঙ্গে হন। স্ট্যালোনের কাছে সেটি ছিল বড় সৌভাগ্য। 'দ্য স্টেপস' তিনি উৎসর্গ করেছেন ফ্ল্যাভিনকে।
পাঁচ দশকে রকি একটি চলচ্চিত্র থেকে অনেক বড় কিছু হয়ে উঠেছে। ফিলাডেলফিয়ার মিউজিয়াম অব আর্টের ৭২টি সিঁড়ি আজ রকির সঙ্গে এতটাই যুক্ত যে সেগুলো হয়ে উঠেছে এক ধরনের তীর্থস্থান। প্রতিবছর অসংখ্য দর্শক সেখানে গিয়ে রকির মতো হাত তুলে ছবি তোলেন, সিঁড়ি বেয়ে ওঠেন। রকির ব্রোঞ্জের মূর্তিও শহরের অন্যতম পরিচিত প্রতীক হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালে ছবির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ফিলাডেলফিয়ায় আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ 'রকি সিজন'। শহরজুড়ে সিনেমাটির সঙ্গে সম্পর্কিত নানা আয়োজন, প্রদর্শনী ও স্মরণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্যাপন করা হচ্ছে এই চরিত্রকে। এমনকি 'রকি' নিয়ে শিল্প, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়েও প্রদর্শনী হয়েছে ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়াম অব আর্টে। 'রাইজিং আপ: রকি অ্যান্ড দ্য মেকিং অব মনুমেন্টস' প্রদর্শনীতে রকির মূর্তি, বক্সিং, শহরের ইতিহাস এবং 'আন্ডারডগ' ধারণার সাংস্কৃতিক অর্থকে একসঙ্গে দেখা হয়েছে।
স্ট্যালোন তারকা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের শরীরের ওপরও তিনি ভয়াবহ চাপ দিয়েছেন। 'রকি থ্রি'-তে চরিত্রটিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি পেশিবহুল, আত্মমগ্ন ও অহংকারী হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই শারীরিক রূপান্তরের জন্য শরীরের চর্বির হার নামিয়ে এনেছিলেন মাত্র ২ শতাংশে।