লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন বোন খুনের ঘটনার চার মাস পার হলেও হত্যার কারণ ও রহস্য উদঘাটন হয়নি। এতে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন পরিবারের বেঁচে থাকা একমাত্র সদস্য জুনায়েদ ইসলাম ওরফে সিফাত (১৮)। তিনি বলেন, ‘বিচার তো অনেক দূরের কথা, চার মাস পার হয়ে গেল, আমার মা ও তিন বোনকে কেন হত্যা করা হলো, এখনো সেই কারণই জানতে পারলাম না।’
গত ২৫ জুন রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীপারের একটি ভাড়া বাসায় জুনায়েদের মা ও তিন বোনকে হত্যা করা হয়। বর্তমানে জুনায়েদ পাশের আরেকটি বাসায় থাকেন এবং এলাকার একটি রড সিমেন্টের দোকানে চাকরি করেন। শনিবার সেই দোকানের পাশের একটি কক্ষে তাঁর সঙ্গে কথা হয়।
জুনায়েদ জানান, সারা দিন দোকানেই সময় কাটে, রাতে বাসায় ফেরেন। বাসায় ফিরলে কেবল মা ও তিন বোনের কথা মনে পড়ে। তিনি বলেন, ‘মা ও বোনদের জন্য খুব কষ্ট হয়। প্রতিটি দিন কষ্টে কাটে। এই কষ্ট কাউকে বোঝাতে পারব না। রাতে বাসায় ফিরলে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। বিছানায় ছটফট করি, কিন্তু ঘুম আসে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিনই মনে হয়, মা ও বোনেরা বুঝি বাসায় আছে। তাঁদের সঙ্গে কাটানো সময়ের কথা মনে পড়ে। পরে মনে হয়, আমার কষ্ট বোঝার মতোও কেউ আর দুনিয়ায় নেই।’
খুনের ঘটনায় জুনায়েদ রায়পুর থানায় একটি মামলা করেন। অন্যদিকে গণপিটুনিতে অন্তর মজুমদারের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি হত্যা মামলা করে। দুটি মামলার মধ্যে একটিরও তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
জুনায়েদ বলেন, ‘পুলিশ সব দিক খতিয়ে দেখুক। অন্তর একাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, নাকি অন্য কেউ জড়িত ছিল, তা বের করা হোক। আমি প্রকৃত ঘটনা জানতে চাই। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’
উল্লেখ্য, গত ২৫ জুন রাতে বাড়িতে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় জুনায়েদের মা শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তাঁর তিন বোন সাইমা আক্তার (২১), নাফিসা আক্তার ওরফে ইকরা (১৭) ও ফাতেমা আক্তার ওরফে সিফাকে (১০)। খুনের পর পালানোর সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে (২৮) আটক করে স্থানীয় লোকজন পিটুনি দেন। পরে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। অন্তরের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায়।
খুনের পরদিন বিকেলে পৌর শহরের ধানহাটা এলাকায় নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাঁদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার হোমনায় নিয়ে লাশ দাফন করা হয়।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে প্রেমঘটিত বিরোধ, অর্থ লেনদেন, স্বর্ণালংকার লুট কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এসবের কোনোটির পক্ষেই নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর ভাড়া বাসাটিতে তল্লাশি চালিয়ে কিছু স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ফলে কেবল লুটপাটের উদ্দেশ্যেই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে পুলিশ মনে করছে না।
নিহতদের পরিবারের ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন বাসায় পাওয়া যায়নি; পরে যেখানে অন্তরকে গণপিটুনি দেওয়া হয় সেখান থেকে ফোন দুটি উদ্ধার হয়। অন্তরই ফোন দুটি বাসা থেকে নিয়ে বের হয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এছাড়া পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে অন্তরের মুঠোফোনে পূর্বে কোনো যোগাযোগ ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হয়েছে। তবে নিয়মিত যোগাযোগের প্রমাণ মেলেনি বলে জানান তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
দুটি মামলার তদন্ত করছেন রায়পুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল মান্নান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুটি মামলাই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই সাক্ষ্যপ্রমাণ, আলামত, ফরেনসিক তথ্য ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ‘এটি একটি বহুল আলোচিত মামলা। তাই তদন্তে কোনো ধরনের তাড়াহুড়া না করে প্রতিটি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে পুলিশ আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’