চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত এক নারীকে উদ্ধারের বদলে অনেকে ছবি ও ভিডিও ধারণে ব্যস্ত ছিলেন। স্থানীয়দের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, কাপ্তাই সড়কের চন্দ্রঘোনা চারা বটতলা এলাকায় দ্রুতগতির অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় বীনা নাথ নামের ওই নারী রক্তাক্ত অবস্থায় সড়কে পড়ে থাকেন। পরে কয়েকজন স্থানীয় নেতা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
ঘটনাটি শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয়; এর ভেতরে বড় সামাজিক প্রশ্ন লুকিয়ে আছে—বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্যের আগে ছবি তোলা কি জরুরি হয়ে উঠছে? মোবাইল ফোন জীবনে সুবিধা আনলেও আচরণ বদলে দিয়েছে। দুর্ঘটনা, মারামারি, আগুন কিংবা অসুস্থতা—সবই এখন অনেকের কাছে ক্যামেরার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতার সঙ্গে ‘বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট’ বা দর্শক-প্রভাবের সম্পর্ক রয়েছে। বিপদ দেখলে অনেকে ধরে নেন, অন্য কেউ সাহায্য করবেন। ফলে আশপাশে বহু মানুষ থাকলেও সাহায্যের হাত বাড়ে না। এছাড়া বাংলাদেশে আহতকে সাহায্য করতে গিয়ে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ, আইনি ঝামেলা বা ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কাও কাজ করে।
ট্রমা রোগীদের নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণের অভাব, আহতের ক্ষতি বেড়ে যাওয়ার ভয়, অ্যাম্বুলেন্সের সীমিত প্রাপ্যতা এবং পুলিশি-আইনি প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা মানুষকে সাহায্য থেকে বিরত রাখে। তাই সমস্যাটিকে শুধু ‘মানুষ নিষ্ঠুর হয়ে গেছে’ বলে দেখা ঠিক হবে না; সামাজিক অভ্যাস, সচেতনতার ঘাটতি, প্রশিক্ষণের অভাব ও নিরাপদ সহায়তার ব্যবস্থার অভাবও দায়ী।
তবে ক্যামেরা সবসময় অপরাধ নয়। দুর্ঘটনার ছবি বা ভিডিও অপরাধী শনাক্তকরণ, নিখোঁজ ব্যক্তির পরিচয় পৌঁছানো কিংবা তদন্তে সহায়তা করতে পারে। রাঙ্গুনিয়ার ঘটনাতেও আহত নারীর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তার পরিবার তাকে শনাক্ত করতে পেরেছিল। সমস্যা তখনই, যখন ছবি তোলা সাহায্যের জায়গা দখল করে নেয়।
নৈতিকভাবে আহত ব্যক্তির প্রথম কাজ নিরাপদ করা, জরুরি সহায়তা ডাকা এবং প্রয়োজনে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা। এরপর প্রয়োজন হলে প্রমাণ হিসেবে ছবি বা ভিডিও ধারণ করা যেতে পারে। একজন মানুষের জীবন আর একটি ভাইরাল ভিডিওর মধ্যে অগ্রাধিকার কোনটি—এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সামাজিক মূল্যবোধেই রয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহতের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রশিক্ষিত স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা দ্রুত পৌঁছে ১০ বছরের কার্যক্রমে ৩ হাজারের বেশি দুর্ঘটনায় প্রায় ৬ হাজার আহত ব্যক্তিকে সেবা দিয়েছেন; তাঁদের ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রে প্রথম সাড়াদানকারী পাঁচ মিনিট বা তার কম সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন।
সবাই চিকিৎসক হতে পারবেন না, কিন্তু প্রাথমিকভাবে কী করতে হবে তা জানা একজন সাধারণ মানুষও জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। দুর্ঘটনা দেখলে প্রথমে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত জরুরি সেবা বা পুলিশকে খবর দিতে হবে। আহত সচেতন থাকলে কথা বলে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতে হবে; প্রশিক্ষণ ছাড়া গুরুতর আহতকে টেনে তোলা বা অপ্রয়োজনে নড়াচড়া করানো ঝুঁকিপূর্ণ।
আহত ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর আগে তার মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কথা ভাবতে হবে। কারও দুর্দশা যেন অন্যের বিনোদনের উপকরণ না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। শুধু ‘মানবিক হোন’ বললে হবে না; রাষ্ট্রকেও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং সড়ক দুর্ঘটনায় করণীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে। মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলা যেতে পারে। দুর্ঘটনার পর সাধারণ মানুষ কোথায় ফোন করবেন, তা দেশব্যাপী আরও দৃশ্যমান করা দরকার।
সৎ উদ্দেশ্যে আহতকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে যেন অযথা হয়রানি বা আইনি জটিলতায় পড়তে না হয়, সে বিষয়ে পরিষ্কার নীতিমালা ও জনসচেতনতা প্রয়োজন। টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউব, স্কুল, মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার—সব জায়গায় একটি বার্তা পৌঁছে দিতে হবে: ‘দুর্ঘটনা দেখলে আগে সাহায্য করুন, পরে ছবি তুলুন।’
আজ সড়কে পড়ে থাকা অচেনা নারীকে দেখে আমরা থেমে যাই; কিন্তু থামার পর কী করি, সেটি ভেবে দেখার বিষয়। মোবাইল, ক্যামেরা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থাকবে, কিন্তু প্রযুক্তি যেন মানুষের মানবিকতা প্রতিস্থাপন না করে। কারণ একদিন রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষটি আমাদের পরিচিত কেউ হতে পারেন—মা, বোন, স্ত্রী, বাবা কিংবা সন্তান।
সেদিন আমরা চাইব না, মানুষ শুধু ছবি তুলুক; চাইব কেউ এগিয়ে আসুক, বলুক ‘ভয় পাবেন না, আমরা আছি।’ বীনা নাথের ঘটনা তাই শুধু দুর্ঘটনার গল্প নয়—এটি আমাদের সামনে প্রশ্ন রেখে যায়: মানুষ বিপদে পড়লে আমরা দর্শক হব, নাকি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াব? ছবি একটি ঘটনা ধরে রাখতে পারে, কিন্তু সময়মতো বাড়িয়ে দেওয়া একটি হাতই হয়তো একটি জীবন বাঁচাতে পারে।