যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ফ্লোরিডার একটি আবাসিক এলাকায় রোববার ৯ জন আরোহী নিয়ে একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে। ব্যস্ত সড়কের পাশের বাড়িঘর থেকে সামান্য দূরে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা ঘটে। মার্কিন পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি জানিয়েছেন, উড়োজাহাজে থাকা সবাই নিহত হয়েছেন।
উড়োজাহাজের আরোহী যাত্রীর ধারণ করা ভিডিওতে দুর্ঘটনার ভয়াবহ মুহূর্ত ধরা পড়েছে। বাহামাগামী উড়োজাহাজটি আকাশ থেকে ছিটকে সড়কের পাশে আছড়ে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। সড়কে তৈরি হওয়া বড় গর্তের চারপাশে পিচ ও কংক্রিটের টুকরোর মধ্যে আগুনের শিখা জ্বলছিল। প্রত্যক্ষদর্শী বাসিন্দারা জানান, আবাসিক এলাকা থেকে মাত্র কয়েক ফুট এবং সড়কে চলাচলরত যানবাহন থেকে ইঞ্চি পরিমাপ দূরে উড়োজাহাজটি আছড়ে পড়ে। দুর্ঘটনাস্থল ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল।
পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে লিখেছেন, লিয়ারজেট ৬০ মডেলের উড়োজাহাজটি দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে পাম বিচ কাউন্টিতে বিধ্বস্ত হয়। এই ঘটনাকে তিনি 'ভয়াবহ ট্র্যাজেডি' বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান, ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডের (এনটিএসবি) তদন্তে সহায়তা করতে ফেডারেল বেসামরিক বিমান চলাচল প্রশাসন একটি দল পাঠাচ্ছে।
ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস বলেছেন, উড়োজাহাজের বাইরে নিচে থাকা কারও হতাহত হওয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'এটি একটি বিধ্বংসী উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা। মনে হচ্ছিল, আকাশ থেকে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র নেমে আসছিল। দুর্ঘটনায় সড়কের পাশে বেশ বড় একটি গর্ত তৈরি করেছে।'
গত রোববার ওই অঞ্চলে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। জাতীয় আবহাওয়া পরিষেবা জানিয়েছে, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে সোমবার বিকেল পর্যন্ত বন্যা সতর্কতা জারি ছিল। ফেডারেল বেসামরিক বিমান চলাচল প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি টেক্সাসের অস্টিন-বার্গস্ট্রম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করেছিল এবং বাহামার দিকে যাচ্ছিল। বিমানটি কী কারণে বিধ্বস্ত হয়েছিল বা এতে কারা ছিলেন, কর্তৃপক্ষ তা সঙ্গে সঙ্গে জানাতে পারেনি।
উড়োজাহাজটি ৩৫ হাজার ফুট (প্রায় ১১ কিলোমিটার) ওপর দিয়ে পূর্ব দিকে যাওয়ার সময় পাইলটরা খারাপ আবহাওয়ার কারণে ঝাঁকুনি, বরফ জমা এবং বৃষ্টির কথা জানান। তাঁরা আরও ২ হাজার ফুট (প্রায় ৬১০ মিটার) ওপরে ওঠার অনুরোধ জানান। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের অডিও রেকর্ডিং এবং ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, এর কিছুক্ষণ পরেই উড়োজাহাজটি দ্রুত গতিতে নিচে নামতে শুরু করে। প্রথমে প্রতি মিনিটে ১০ হাজার ফুট, তারপর প্রতি মিনিটে ২০ হাজার ফুট এবং শেষ পর্যন্ত প্রতি মিনিটে ৩০ হাজার ফুট গতিতে নিচে নামতে থাকে। যাতে উড়োজাহাজটি পুরোপুরি পাইলটদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
দ্রুত একজন পাইলট জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সাহায্যের জন্য বিপদসংকেত পাঠান। ভূমিতে আছড়ে পড়ার ঠিক আগে উড়োজাহাজটি মারাত্মকভাবে ডান দিকে হেলে পড়েছিল। লাইলএটিসি ডট নেট-এ সংরক্ষিত এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের অডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী, দুর্ঘটনার কয়েক মিনিট আগে পাইলট উড়োজাহাজে বরফ জমা এবং প্রচণ্ড ঝাঁকুনির কথা জানিয়েছিলেন। এর ফলে উড়োজাহাজটি প্রায় ৭০০ ফুট পর্যন্ত ওঠানামা করছিল।
পাইলট এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের বলেন, 'আমাদের উড়োজাহাজে কিছুটা স্বচ্ছ বরফ জমছে, যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং মাঝারি ধরনের ঝাঁকুনি হচ্ছে।' কিন্তু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। খারাপ আবহাওয়ার মুখে পড়া এবং উপরে ওঠার অনুরোধ করার পর উড়োজাহাজটি আশঙ্কাজনক হারে উচ্চতা হারাতে শুরু করলে পাইলট জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।
পাইলট রেডিওতে বলেন, 'আমরা ৮ হাজার ফুট নিচে নেমে যাচ্ছি—মেডে, মেডে (বিপদসংকেত), আমরা প্রতি মিনিটে ১০ হাজার ফুট নিচে নামছি।' তিনি আরও বলেন, 'আমাদের গতিসীমা অতিরিক্ত বেড়ে গেছে এবং আমরা প্রতি মিনিটে ২০ হাজার ফুট নিচে নেমে যাচ্ছি।' এরপর তিনি সামনে কী ঘটতে চলেছে, তা নিয়ে এক হৃদয়বিদারক স্বীকারোক্তি দেন, 'আমরা মাটিতে আছড়ে পড়ে বিধ্বস্ত হতে যাচ্ছি।'
অস্টিন-বার্গস্ট্রম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মুখপাত্র জিম রেনল্ডস বলেছেন, উড়োজাহাজটি ব্যক্তি মালিকানাধীন ছিল। এতে কারা ছিলেন, সেই বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি। ফেডারেল কর্মকর্তারা যখন দুর্ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত করছেন, তখন পাম বিচ কাউন্টি কর্তৃপক্ষ পাশের একটি মোবাইল হোম (ট্রেইলার পার্ক) এলাকা থেকে প্রায় ৬০০ বাসিন্দাকে সরিয়ে নেয়। কাউন্টি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সড়কটি বন্ধ থাকবে।
পাম বিচ কাউন্টি শেরিফ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ফ্লোরিডার গ্রিনএকরস এলাকায় উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়েছে। ৪৫ হাজার বাসিন্দার এই শহরটি ওয়েস্ট পাম বিচ থেকে প্রায় ৭ মাইল (১১ কিলোমিটার) দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত।