ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় বন্দরনগরী জামনগর সাধারণত বিদেশি নেতাদের জন্য কোনো প্রচলিত গন্তব্য নয়। তবে সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সফরে শহরটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। রুবিওর এই সফর কেন জামনগরে, আর কেন তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লি এড়িয়ে গেলেন—এ নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাইতে পৌঁছান রুবিও। সেখানে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং দেশটির শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সফর শেষ করেন গুজরাট রাজ্যের জামনগরে, যেখানে এশিয়ার অন্যতম ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন বিশাল তেল শোধনাগার অবস্থিত।
এটি চলতি বছরে রুবিওর দ্বিতীয় ভারত সফর। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সফরে সময় এবং গন্তব্য নির্বাচনই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিকট ভবিষ্যতে নতুন শোধনাগার ক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা কম। এমন পরিস্থিতিতে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার ভারতের সক্ষমতা ওয়াশিংটনের জন্য জ্বালানি বাজারের চাপ কমানোর একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর এ কারণেই রিলায়েন্সের জামনগর শোধনাগার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
তবে এই সফর ভারত-মার্কিন সম্পর্কের একটি জটিল মুহূর্তে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রুশ জ্বালানি কেনার কারণে দিল্লির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে (যদিও বর্তমানে তা স্থগিত)। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে প্রায় ২০ মাস ধরে অনিশ্চয়তা চলছে।
সফরের ঘোষণায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছিল, এই সফরে জ্বালানি সহযোগিতা, বাণিজ্যিক বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর জোর দেওয়া হবে। রুবিওর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে দিল্লি না থাকায় ভারতের বিরোধী রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, গন্তব্য নির্বাচন ছিল কৌশলগত।
আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বিবিসিকে বলেন, “দিল্লিতেই আস্থার ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নীতিতে সেখানকার কর্মকর্তারা অসন্তুষ্ট।” তবে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত মীরা শঙ্কর সতর্ক করে বলেন, রাজধানী এড়িয়ে যাওয়াকে বাড়িয়ে দেখা উচিত হবে না। তিনি বলেন, “এটি মূলত জ্বালানি-কেন্দ্রিক সফর ছিল। এবং সবশেষে রুবিও তো মুম্বাইতেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।”
তাজ হোটেলে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, উভয় পক্ষ বাণিজ্য আলোচনায় অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং দীর্ঘদিনের চুক্তি সম্পন্ন করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
কূটনৈতিক বৈঠক শেষে রুবিও জামনগরে যান, যেখানে আম্বানি সাম্রাজ্যের মূল্যবান সম্পদ অবস্থিত। এই সফরই মূলত রুবিওর ভারত সফরের মূল পরিচয় তৈরি করেছে। শঙ্কর বলেন, শোধনাগার পরিদর্শন “দেখিয়েছে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বাজারে আরও পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্র কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে”।
কোম্পানির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, রিলায়েন্সের জামনগর কমপ্লেক্স প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করতে পারে, যা বৈশ্বিক শোধন ক্ষমতার প্রায় ১.৫ শতাংশ। এটি ডিজেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের একটি বড় রপ্তানিকারক, ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বুধবার সীমিত গণমাধ্যম প্রবেশাধিকারসহ কঠোর নজরদারিতে অনুষ্ঠিত সফরে রুবিও শোধনাগারটি ঘুরে দেখেন এবং মুকেশ আম্বানিসহ আম্বানি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে কোম্পানির বিবৃতিতে বলা হয়, “সফরে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি এবং প্রচলিত ও নতুন জ্বালানিতে বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের সুযোগ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে।” তবে অপরিশোধিত তেল কেনা বা পরিশোধিত পণ্য সরবরাহের কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গীকারের কথা এতে উল্লেখ করা হয়নি।
ঠিক আগের দিন সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রুবিও ভারতকে “শোধনাগার সুপারপাওয়ার” বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় রিলায়েন্স আরও ভেনিজুয়েলার তেল প্রক্রিয়াজাত করুক। তিনি বলেন, “তাদের ভারী অপরিশোধিত তেল শোধনের সক্ষমতা রয়েছে। তারা অতীতেও তা করেছে, এবং আমার মনে হয় ভেনিজুয়েলার আরও তেল বাজারে এলে তারা তা করতে পারে।”
রুবিও যোগ করেন, ভেনিজুয়েলার তেল “স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দিতে পারে” এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার মধ্যে সরবরাহ চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার আগে রিলায়েন্স ভেনিজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা ছিল। চলতি বছর মার্কিন হস্তক্ষেপে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো গ্রেপ্তার হওয়ার পর এবং ওয়াশিংটন দেশটির জ্বালানি খাতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলে রিলায়েন্স আবার বড় আমদানিকারক হিসেবে আবির্ভূত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সফর ভারতের রুশ তেল কেনা নিয়ে দিল্লি-ওয়াশিংটনের মধ্যে কিছুটা টানাপোড়েন কমাতে পারে। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণের পর ভারত রুশ তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা হয়ে ওঠে। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ভারত রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৩৭ শতাংশ কিনেছে। রিলায়েন্স ছিল রুশ অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকারী ভারতীয় কোম্পানিগুলোর একটি।
২০২৫ সালের আগস্টে রুশ তেল কেনার কারণে ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যার ফলে অনেক ভারতীয় পণ্যের মোট শুল্ক দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত শাস্তি প্রত্যাহার করে, তবুও ভারতের রুশ তেল আমদানি ওয়াশিংটন-দিল্লি সম্পর্কে উত্তেজনার কারণ হয়ে রয়েছে। ভারত সবসময় বলে আসছে, ১৪০ কোটি মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করাই তার অগ্রাধিকার।
এরপর চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই রুশ ডিজেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেয়। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা বলছেন, রুবিওর জামনগর সফর যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি লক্ষ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ: রুশ অপরিশোধিত তেলের ওপর ভারতের নির্ভরতা কমানো, ভেনিজুয়েলা ও আমেরিকান তেলের বেশি আমদানি উৎসাহিত করা এবং বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নেওয়া, যেখানে জ্বালানি সহযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।
এই উদ্যোগের পেছনে আরেকটি সম্ভাব্য ব্যবসায়িক দিকও রয়েছে। কুগেলম্যান বলেন, রুবিওর আম্বানি পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, ভেনিজুয়েলার তেলের বেশি পরিশোধন নিশ্চিত করা এবং দ্বিতীয়ত, টেক্সাসে প্রস্তাবিত একটি শোধনাগারে বিনিয়োগে রিলায়েন্সের আগ্রহ অব্যাহত থাকার আশ্বাস পাওয়া।
মার্চে ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে টেক্সাসের ব্রাউন্সভিল বন্দরে একটি প্রস্তাবিত শোধনাগারের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এটি হবে ৫০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বড় নতুন শোধনাগার। রিলায়েন্স এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি এবং প্রকল্পটি বা কাজ কবে শুরু হবে সে সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত তথ্য নেই। কুগেলম্যান বলেন, “টেক্সাসের স্থাপনাটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ভেনিজুয়েলার তেলসংক্রান্ত ব্যবস্থার মতো তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে, তবে আমি মনে করি এটি গল্পের অংশ।”
তবে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রিলায়েন্সের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় অগ্রগতি মানেই বাণিজ্য চুক্তি আসন্ন—এমনটি নয়। কুগেলম্যান বলেন, “আমি মনে করি না এই মুহূর্তে কেউ সত্যিই বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণার প্রত্যাশা করেছিল, তবে এই সফর সম্পর্ককে ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে, যতটা সম্ভব—কারণ উল্লেখযোগ্য উত্তেজনার বিষয়গুলো এখনো রয়ে গেছে।”
ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি কেয়ারএজের প্রধান অর্থনীতিবিদ রাজনী সিনহা বিবিসিকে বলেন, বৃহত্তর সহযোগিতা উভয় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা উদ্বেগ কমাতে, থেমে থাকা বাণিজ্য আলোচনাকে এগিয়ে নিতে এবং ভারতে “বাণিজ্য ও মনোভাব” বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
মীরা শঙ্কর বলেন, ভারত সম্ভবত “যুক্তরাষ্ট্র তার শুল্ক অবস্থান আনুষ্ঠানিক করার অপেক্ষায় রয়েছে, যাতে আমরা জানতে পারি দিল্লি কোনো অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি পাচ্ছে কি না”। তিনি যোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ছে। ভারতের মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পণ্য রপ্তানি ছিল ৫০.৮১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১.১ শতাংশ বেশি।