মার্কিন ডলারনির্ভর সম্পদের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পেতে চীন তার স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যেও দেশটির পরিবারগুলোও এখন নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছে।
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়না সেপ্টেম্বরে টানা ২৩তম মাসের মতো স্বর্ণ কেনার ঘোষণা দিয়েছে। ওই মাসে প্রায় তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ কিনেছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারাবাহিক কেনাকাটা তার বিশাল রিজার্ভের ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টারই অংশ।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ২৩ টন স্বর্ণ কিনেছে, যার ফলে তাদের মোট মজুত দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৪১০ টনে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর এটিই ছিল এক মাসে তাদের সর্বোচ্চ ক্রয়। সেপ্টেম্বর শেষে চীনের মোট সরকারি রিজার্ভের ৮ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল স্বর্ণ, যা ২০২৪ সালের শেষে ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যে সম্পদ ধরে রাখে তা হলো রিজার্ভ, যা আন্তর্জাতিক লেনদেন মেটাতে এবং আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করে। এসব রিজার্ভে সাধারণত বিদেশি মুদ্রা, বিদেশি সরকারের ঋণপত্র এবং স্বর্ণ থাকে।
চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যক্তিগত পর্যায়েও স্বর্ণের চাহিদা বেড়েছে। চায়না গোল্ড অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে স্বর্ণের বার ও কয়েন কেনা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। দাম কমার পরও এই ক্রয় অব্যাহত রয়েছে; গত এক মাসে স্বর্ণের দাম প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল স্বর্ণের দাম কমার পেছনে আংশিকভাবে ডলারের শক্তি এবং মার্কিন সরকারি ঋণপত্রে উচ্চ মুনাফাকে দায়ী করেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোর ফলে এসব বিনিয়োগ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে, কারণ এতে সুদ পাওয়া যায়। ফলে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছে সুদবিহীন স্বর্ণের চেয়ে এসব বিনিয়োগ বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
ফ্রাঙ্কফুর্টের কমার্সব্যাংকের পণ্য গবেষণা প্রধান থু লান গুয়েনের মতে, চীনের একটি মূল লক্ষ্য হলো মার্কিন সরকারি ঋণপত্র বা ট্রেজারির ওপর নির্ভরতা কমানো। চীনের ডলারভিত্তিক সম্পদে উল্লেখযোগ্য রিজার্ভ রয়েছে, ফলে স্বর্ণ কেনা ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের প্রতি তাদের ঝুঁকি কমায়। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “চীনের স্বর্ণ ক্রয় তার রিজার্ভকে আরও সক্ষম ও স্থিতিশীল করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।”
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলারের বিদেশি সম্পদ জব্দ করে। এতে প্রমাণিত হয়েছে, বিদেশে রাখা রিজার্ভ কত দ্রুত অপ্রাপ্য হয়ে উঠতে পারে।
চীনের উদ্বেগের কারণ হতে পারে, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো সংঘাতে তার বিদেশি সম্পদও অনুরূপ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে। গুয়েন বলেন, “দেশের ভেতরে রাখা স্বর্ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো এটি অন্য কোনো দেশের ওপর দাবি হিসেবে থাকে না, ফলে নিষেধাজ্ঞা বা সম্পদ জব্দের ঝুঁকি অনেক কম।” তিনি আরও বলেন, “আমি এটিকে মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখছি,” এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক-রাজস্ব ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা ঋণ আরেকটি অনিশ্চয়তার কারণ। চলতি বছরের শুরুতে প্রথমবারের মতো দেশটির ঋণের পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস পূর্বাভাস দেয়, জনসাধারণের কাছে থাকা ফেডারেল ঋণ ২০২৬ সালে মার্কিন অর্থনীতির ১০১ শতাংশ থেকে ২০৩৬ সালে ১২০ শতাংশে উন্নীত হবে। ভবিষ্যতে কোনো অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে ওয়াশিংটন এই ঋণ পরিশোধ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগের পেছনে এটিই প্রেক্ষাপট। এই ঋণের বড় অংশ চীনের কাছে রয়েছে। তাই স্বর্ণ কম অস্থির ও কম ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চীনের পরিবারগুলোর স্বর্ণ কেনার প্রেরণা ভিন্ন। অন্য বিনিয়োগে আস্থা কমে গেলে সঞ্চয় ধরে রাখার উপায় হিসেবে স্বর্ণ বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। গুয়েন বলেন, “স্বর্ণের শক্তিশালী চাহিদা আংশিকভাবে মূল্যের বিকল্প ভান্ডারের সন্ধানের প্রতিফলন।” ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল চীনের দুর্বল শেয়ারবাজারকে অভ্যন্তরীণ স্বর্ণ চাহিদার একটি সহায়ক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি দেশটির আবাসন খাত অতিরিক্ত ঋণ ও অতিরিক্ত নির্মাণের বোঝায় জর্জরিত, যার ফলে বাড়ির দাম কমছে এবং এটি দুর্বল বিনিয়োগে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, চীনের বর্ধিত স্বর্ণ ক্রয় ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যের আসন্ন সমাপ্তির ইঙ্গিত দেয় না। গুয়েন বলেন, “এটিকে ডলার থেকে বড় ধরনের সরে আসা হিসেবে বর্ণনা করতে আমি সতর্ক থাকব। ডলার এখনও অনেকাংশে প্রধান বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা।” তবে যদি চীন ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নতুন রিজার্ভের বড় অংশ স্বর্ণে বিনিয়োগ করে এবং স্বাভাবিকের চেয়ে কম মার্কিন সম্পদ কেনে, তাহলে ধীরগতির পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এতে মার্কিন সরকারি ঋণের একটি চাহিদার উৎস দুর্বল হতে পারে। তবে এর প্রভাব নির্ভর করবে এই পরিবর্তন কত দ্রুত ও কত ব্যাপকভাবে ছড়ায় তার ওপর।
গুয়েন বলেন, “মূল কথা হলো, এটি ডলারকে হঠাৎ পরিত্যাগ করা নয়, বরং ধীরগতির বৈচিত্র্যায়ন প্রক্রিয়া।” তিনি যোগ করেন, এই প্রবণতা ব্যাপক ও দ্রুত না হলে মার্কিন অর্থনীতিতে এর প্রভাব সীমিত থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য সহজলভ্য বিদেশি মুদ্রা প্রয়োজন এবং এসব লেনদেনে ডলারই কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে। তাই স্বর্ণ আর্থিক সুরক্ষা দিতে পারে, কিন্তু ডলার রিজার্ভের সব কার্যকারিতা সরাসরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
গুয়েনের মতে, চীন একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ, বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে। তিনি বলেন, “এই প্রবণতা বিশেষভাবে উদীয়মান বাজারভুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্পষ্ট। তবে নিষেধাজ্ঞা এর একমাত্র কারণ নয়।”
পোল্যান্ডও এখন বেশি স্বর্ণ কেনার দেশ হিসেবে পরিচিত। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ৩১ টন এবং জুলাই মাসে আরও ৮ টন স্বর্ণ কিনেছে।
বড় মজুত মানেই সাম্প্রতিক ক্রয় নয়। উদাহরণস্বরূপ, ভারত জুন মাসে নিশ্চিত করেছে যে তাদের ভৌত স্বর্ণের মজুত প্রায় ৮৮০ দশমিক ৫ টনে অপরিবর্তিত রয়েছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে ভারতের স্বর্ণ রিজার্ভে খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। ২০২৫ সালে তারা প্রায় চার টন কিনেছিল, যা ২০২৪ সালের ৭৩ টনের তুলনায় কম।
চীনের ধারাবাহিক ক্রয় সত্ত্বেও তাদের মজুত যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম। ২০২৫ সালের শেষে চীনের প্রায় ২,৩০০ টন মজুত যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮,১৩৩ টনের এক-তৃতীয়াংশেরও কম।