Deleted
প্রকাশ : Oct 27, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

উত্তর প্রদেশে 'অপারেশন ল্যাংড়া': গরু পাচারের অভিযোগে পুলিশের গুলিতে পঙ্গু মুসলিমরা

ভারতের উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে পুলিশের গুলিতে শত শত সন্দেহভাজন আহত হয়েছেন বলে একটি তদন্তে উঠে এসেছে। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজ্য পুলিশ প্রায় একই কায়দায় এসব গুলি চালিয়েছে, যার মূল লক্ষ্য ছিলেন মুসলিমরা। পুলিশের ভিডিওগুলো দেখলে মনে হবে যেন আগে থেকে লেখা কোনো চিত্রনাট্য, যেখানে অন্ধকারে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন পায়ে গুলিবিদ্ধ এক ব্যক্তি, আর পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

অপরাধ দমনের বড় অভিযানের অংশ হিসেবে পুলিশ এসব গোলাগুলির কথা প্রচার করেছে এবং এগুলো আত্মরক্ষার খাতিরে করা হয়েছে বলে দাবি করেছে। তবে অধিকারকর্মী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং স্থানীয় বিচারকেরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের মতে, এই সহিংসতা মূলত বিচারবহির্ভূত শাস্তি এবং ভয় দেখানোর শামিল, যা ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে এবং আইনের শাসনকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

দিল্লির মানবাধিকার আইনজীবী মঙ্গলা ভার্মা বলেন, ‘এটি এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি। এটি এখন পুলিশের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তদন্ত করার বদলে পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে হত্যা বা আহত করছে, আর এভাবেই যেন বিচার শেষ হয়ে যাচ্ছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘দ্য সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’ তথ্য সংগ্রহ করেছে, যেখানে দেখা যায় ২০২০ সাল থেকে উত্তর প্রদেশ পুলিশের গুলিতে গরু পাচারে জড়িত অভিযোগে প্রায় ৬৫০ জন সন্দেহভাজন আহত হয়েছেন। এসব তথ্য শুধু এপিকে দেওয়া হয়েছিল, এরপর এপি স্বাধীনভাবে প্রায় ২০০টি ঘটনার নমুনা যাচাই করে দেখেছে। এসব ঘটনার বিশাল অংশজুড়ে রয়েছেন মুসলিমরা।

একের পর এক ঘটনায় দেখা গেছে, সন্দেহভাজনদের শরীরের ঠিক একই জায়গায় গুলি লেগেছে—তা হলো পা, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা হাঁটুর নিচে। পুলিশ কেবল যেসব ঘটনা নিজেরাই প্রকাশ করেছে, প্রতিবেদনটি সেসব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তাই প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উত্তর প্রদেশের শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা অমিতাভ যশ এপিকে বলেন, পুলিশকে কেবল আত্মরক্ষার্থে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের তুলনায় তাঁর রাজ্যের পুলিশ মাথাপিছু হিসাবে অনেক কম সন্দেহভাজনকে হত্যা বা আহত করেছে। অমিতাভ যশ আরও দাবি করেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পায়ে গুলি করার কোনো নির্দেশ নেই এবং এ বিষয়ে উপযুক্ত অভিযোগ দায়ের করা হলে তাঁরা তদন্ত করে দেখবেন।

তিনি বলেন, ‘পুলিশের প্রতিটি কাজের জন্যই তাদের জবাবদিহি করতে হবে। সেটা মৃত্যু হোক বা আহত হওয়ার ঘটনা হোক, প্রতিটি কাজই যাচাই-বাছাইয়ের জন্য উন্মুক্ত।’ তিনি আরও জানান, ‘গত এক বছরে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের জন্য কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়ার মতো কোনো কারণ ঘটেনি।’

গুলি করে আহত করার এই কৌশল স্থানীয়ভাবে ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ বা ‘অপারেশন লেম’ নামে পরিচিত, যা এখন পুরো উত্তর প্রদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। গরু পাচারে জড়িত সন্দেহভাজনদের পাশাপাশি চুরি ও ধর্ষণের মতো অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও একই কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। ভারতে গবাদিপশু পাচার অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ, কারণ সেখানে হিন্দুরা গরুকে ভক্তি করে এবং গরু সুরক্ষার বিষয়টি রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলে।

তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ভারতে, যেখানে পুলিশ প্রায়ই সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে সন্দেহভাজনদের গুলি করে হত্যা করে। কিছু অধিকারকর্মী মনে করেন, পুলিশ এখন তাদের কৌশল পাল্টে জনগণের ক্ষোভ এড়াতে হত্যার বদলে গুলি করে আহত করছে, যা স্থানীয়ভাবে ‘হাফ এনকাউন্টার’ নামে পরিচিত।

ভারতের হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং উত্তর প্রদেশে তাঁর মিত্রদের কঠোর পুলিশি ব্যবস্থায় এই সহিংসতা শুরু হয়েছে। অপরাধীদের মনে ভয় ঢোকাতে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাঁরা অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রচার করেছেন। উত্তর প্রদেশের নেতৃত্বে আছেন উগ্র হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথ, যিনি হিন্দু সন্ন্যাসী থেকে রাজনীতিবিদে পরিণত হয়েছেন এবং মোদির বিজেপি দলের একজন শীর্ষস্থানীয় সদস্য।

২০১৭ সালের মার্চ মাসে আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এপির পাওয়া পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সেই সময় থেকে এ বছরের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত ৩১৬ জন সন্দেহভাজন ‘এনকাউন্টারে’ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১১০ জনই ছিলেন মুসলিম। এই হার রাজ্যের মোট মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতের চেয়ে অনেক বেশি, যেখানে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন মুসলিম। একই সময়ে ১২ হাজার ৮৯০ জন সন্দেহভাজন আহত হয়েছেন, অন্যদিকে দায়িত্ব পালনকালে ১৮ জন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ১ হাজার ৯৫৩ জন আহত হয়েছেন। পুলিশের গুলিতে আহত সন্দেহভাজনদের ধর্মের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ বছরের শুরুতে উত্তর প্রদেশ পুলিশ এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, জিরো টলারেন্স নীতিটি ‘অপরাধীদের মনে ভয় বাড়িয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি জোরদার করেছে’। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এ কারণেই জাতীয় পর্যায়ে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার প্রশংসা করা হচ্ছে।’ অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই চর্চা এখন বিজেপিশাসিত আশপাশের রাজ্যগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে, যার মধ্যে রয়েছে হরিয়ানা, বিহার, উত্তরাখণ্ড এবং দিল্লির সীমান্তবর্তী এলাকা।

পুলিশের প্রকাশ করা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলোতে কর্মকর্তারা প্রায় একই রকম দৃশ্য বর্ণনা করেন—সন্দেহভাজনেরা পালাচ্ছে, পুলিশের ওপর গুলি চালানো হচ্ছে এবং পুলিশ হত্যা না করে অচল করার জন্য গুলি ছুড়ছে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, ভারতে পুলিশের বেশির ভাগ গোলাগুলির ঘটনা তখন ঘটে, যখন সন্দেহভাজনের কাছ থেকে কোনো হুমকি থাকে না। হাঁটুর নিচে গুলি লাগার এই ধারাবাহিক ধরন নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁদের মতে এটি প্রমাণ করে এসব আঘাত প্রকৃত অর্থে আত্মরক্ষার্থে করা হয়নি।

উত্তর প্রদেশভিত্তিক অধিকারকর্মী এবং বিরোধীদলীয় নেতা সন্দীপ পান্ডে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা আইনকে তামাশায় পরিণত করেছে। এগুলো পুরো ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি রাষ্ট্র-সমর্থিত সহিংসতা।’

উত্তর প্রদেশের আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের জওহরলাল নেহরু মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিনের অধ্যাপক মোহাম্মদ কালিম খান বলেন, দূর থেকে পালিয়ে যাওয়া বা লড়াইরত কোনো ব্যক্তির পায়ের পেছনের মাংসপেশিতে হাড় স্পর্শ না করে সমান্তরালভাবে গুলি লাগার সম্ভাবনা খুবই কম। তিনি বলেন, ‘এটি আত্মরক্ষার্থে করা গুলি নয়। এটি ইচ্ছাকৃতভাবে খুব কাছ থেকে করা গুলি।’

এই সহিংসতা বিচার বিভাগেরও নজরে এসেছে। গত জানুয়ারিতে রাজ্যের সর্বোচ্চ বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ এলাহাবাদ হাইকোর্ট উত্তর প্রদেশে পুলিশের ক্রমবর্ধমান গোলাগুলির ঘটনার কঠোর সমালোচনা করেন, যা ছিল এক বিরল ঘটনা। আদালত সতর্ক করে দেন, পুলিশ কর্মকর্তারা বিচারব্যবস্থার জায়গা নিতে পারেন না এবং আইনিভাবে বাধ্যতামূলক প্রতিবেদন ও তদন্তপ্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় পুলিশকে তিরস্কারও করেন।

এ বছরের শুরুতে একটি জামিন শুনানির রায়ে এক বিচারক লিখেছেন, ‘এই আদালত লক্ষ করেছে, পুলিশের এনকাউন্টার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে আসামিদের পায়ে গুলি করার চর্চা যেন নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ আইনের শাসনে এ ধরনের আচরণকে তিনি ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন। হাইকোর্ট ইঙ্গিত দেন, কিছু কর্মকর্তা হয়তো ক্যারিয়ারের উন্নতি বা প্রচারের আশায় এমনটি করতে পারেন এবং পুলিশ সম্ভবত ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বা সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পেতে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করছে’।

জুনে আরেকটি ভিন্ন মামলায় হাইকোর্টের অন্য এক বিচারক লিখেছেন, উত্তর প্রদেশে ‘প্রাতিষ্ঠানিক বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ চলছে এবং এ বিষয়ে তাঁর ‘গভীর সাংবিধানিক উদ্বেগ’ রয়েছে। প্রকাশ্যে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করা সত্ত্বেও, গত এক দশকে বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণ বেশ ধীরগতিতে চলেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে মানবাধিকার সংগঠন ‘পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ’ উত্তর প্রদেশে পুলিশের এনকাউন্টার হত্যার প্রমাণ উপস্থাপন করে একটি স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে তদন্তের আবেদন জানায়, মামলাটি এখনো বিচারাধীন। এর পর থেকে উত্তর প্রদেশে পুলিশের গোলাগুলির ঘটনা, যাতে মৃত্যু ও আহতের ঘটনা ঘটছে, তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অমিতাভ যশ বিচারব্যবস্থাকে রাজনীতিকরণের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, সন্দেহভাজনদের গুলি করার জন্য পুলিশকে কোনো পুরস্কার দেওয়া হয় না। তিনি বলেন, ‘পুলিশের কোনো অভিযানের সঙ্গে পদোন্নতি বা ক্যারিয়ারের অগ্রগতির কোনো নীতি নেই। একেবারেই নেই।’

বার্তা সংস্থা এপি উত্তর প্রদেশের ছয়জন মুসলিম পুরুষের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে, যাঁরা সবাই পুলিশের গুলিতে পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন। সবাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন, কারণ প্রকাশ্যে কথা বলতে তাঁরা অত্যন্ত ভয় পান।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ২০২৬: গণিত অধ্যায় ৮ পরিমাপের শূন্যস

1

মাস্কের ডোজের নথি চেয়ে মামলা, শুনবে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট

2

সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনে অগ্নিকাণ্ড, দ্রুত নিভিয়ে ফেলা হয়েছে

3

রংপুরে প্রশাসনের সমালোচনায় এমপি মাহবুবুর রহমান, ভিডিও ভাইরা

4

ওপেনএআই অফিসে গোপন রেকর্ডিং ডিভাইস স্থাপনের অভিযোগ সৌদি নাগর

5

শরীয়তপুর সাংবাদিক সমিতির সভাপতি পলাশ, সম্পাদক মামুন

6

সরকারি ভবনের ছাদে ৩৭০ কোটি টাকার সৌর প্যানেল, রক্ষণাবেক্ষণ ন

7

বদলে যাচ্ছে বড়গাঙের চেনা রূপ

8

আরজে মিত্তে: সেরিব্রাল পালসি সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদল

9

সাংবাদিকদের দ্রুত অ্যাক্রিডিটেশন প্রদানের আহ্বান অনলাইন এডিট

10

মনোনয়ন যুদ্ধে দুই বাংলাদেশি প্রার্থী

11

শখ থেকে পেশা: শখের কাজেই ক্যারিয়ার গড়ার নতুন ধারা

12

সংবিধানে ফিরছে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’

13

কাশ্মীরে ওয়াকফ বোর্ডের সমন্বিত জুমার খুতবার প্রস্তাবের বিরু

14

জাপানে 'দত্তক ঘরজামাই' হওয়ার আইনি সুযোগ, বিদেশিরাও আবেদন কর

15

দূতাবাস থেকে কিম্বারলি গিলফয়েলের পদত্যাগের নির্দেশ ট্রাম্পে

16

শেকৃবি মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাতিলের দাবি

17

যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকে ঢুকলে দেখা যাচ্ছে নতুন বার্তা

18

রেফারিকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যে ২৫ হাজার পাউন্ড জরিমানা গুনল

19

বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান কোনো ভেদাভেদ নেই: স

20