যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের আশঙ্কা যতই বাড়ছে, ততই সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের মধ্যে চলমান সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা কেন সৌদি আরবের ওপর হামলা জোরদার করছে, বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে তারা কী অর্জন করতে চায়—এসব প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েকদিনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট অন্তত ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, খামিস মুশাইত শহরে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এছাড়া আভা, তাইফ, নামাস ও জিজান শহরেও সতর্কতা জারি করা হয়। খামিস মুশাইতকে লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে রোববার (২৫ অক্টোবর) স্থানীয় সময় ভোরে অন্তত তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। প্রাণঘাতী হুতি হামলার জেরে দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি চলছিল। এমন পরিস্থিতিতে হুতিরা সতর্ক করে জানায়, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুনরায় চালুর পরিকল্পনা থাকলেও এটি তাদের কাছে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবেই বিবেচিত হবে। চলতি মাসের শুরুর দিকে হুতিদের এক হামলায় ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন।
তবে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার এই সংঘাত কেবল বিমানবন্দর বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথের নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়।
কেন এখন হামলা জোরদার করছে হুতিরা? ইয়েমেনের অভ্যন্তরে নতুন করে শুরু হওয়া লড়াই হুতিদের হামলা জোরদারের তাৎক্ষণিক কারণ। তবে এর পাশাপাশি সৌদি আরবের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগকেও নিজেদের দর-কষাকষির অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে দেখছে গোষ্ঠীটি। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি নাজুক যুদ্ধবিরতির ফলে ইয়েমেন থেকে সৌদি আরবের ভূখণ্ডে বড় ধরনের আন্তসীমান্ত হামলা অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইয়েমেনের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধের জেরে সেই সমঝোতা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে।
এই পরিস্থিতিতে হুতিরা আবারও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। এর মাধ্যমে তারা একদিকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা তুলে ধরতে চাইছে, অন্যদিকে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তবে সংঘাতের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
শেষ পর্যন্ত হুতিরা কী চায়? ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলজুড়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত করেছে হুতিরা। গত সেপ্টেম্বর বাব এল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি কৌশলগত অবস্থানগুলো দখলে নেয় গোষ্ঠীটি। এর জবাবে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান শুরু করে। হুতিদের দাবি, সৌদি আরবের সামরিক অভিযান এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে আরোপিত বিধিনিষেধের জবাব দিতেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে আরও বিস্তৃত কৌশল রয়েছে। ইয়েমেনে সৌদি আরবের সম্পৃক্ততার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যয় বাড়িয়ে রিয়াদকে ছাড় দিতে বাধ্য করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
হুতিদের মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইয়েমেনে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা: রাজধানী সানা ও উত্তর ইয়েমেনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং দেশটির ভবিষ্যৎ সরকার গঠনে নির্ধারক ভূমিকা নিশ্চিত করা। বিধিনিষেধ প্রত্যাহার: নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর পুনরায় চালু করা এবং বাইরের সামরিক চাপ কমানো। সৌদি আরবের কাছ থেকে ছাড় আদায়: এমন একটি সমঝোতায় রিয়াদকে রাজি করানো, যেখানে হুতিদের প্রভাব স্বীকৃতি পাবে এবং ইয়েমেনে তাদের বিরোধীদের প্রতি সৌদি সমর্থন সীমিত হবে। কৌশলগত নৌপথের ওপর প্রভাব বিস্তার: বাব এল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি নিজেদের অবস্থান কাজে লাগিয়ে সামরিক সক্ষমতা ও আলোচনায় দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো। আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানো: সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা প্রদর্শন করা। ইরানের সমর্থন অব্যাহত রাখা: সামরিক সুবিধা পেতে ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা, পাশাপাশি ইয়েমেনে নিজেদের স্বতন্ত্র লক্ষ্যও এগিয়ে নেওয়া।
হুতিরা কি ইরানের হয়ে কাজ করছে, নাকি তাদের নিজস্ব এজেন্ডা রয়েছে? হুতিদের কর্মকাণ্ডে ইরানের সমর্থন ও গোষ্ঠীটির নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। তবে হুতিদের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ কতটা, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইরান হুতিদের অস্ত্রপ্রযুক্তি, সামরিক দক্ষতা ও অন্যান্য সহায়তা দিয়েছে। এর ফলে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়াতে পেরেছে গোষ্ঠীটি।
চলতি মাসে প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে ইয়েমেনের বিষয়ে ছাড় আদায়ে চাপ দেওয়া এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমাতে ওয়াশিংটনকে রাজি করানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও এসব হামলা চালানো হয়েছে। তবে হুতিদের কেবল ইরানের তৈরি একটি গোষ্ঠী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ১৯৯০-এর দশকে উত্তর ইয়েমেনে আন্দোলন হিসেবে তাদের উত্থান ঘটে। ২০১৪ সালে সানা দখলের পর থেকে তারা নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড সুসংহত করা, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে দুর্বল করা এবং রাজনৈতিক স্বীকৃতি আদায় করাও তাদের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সমঝোতা হলেও সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার বিরোধের অবসান নিশ্চিত নয়। ইয়েমেনে নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব ধরে রাখার প্রশ্নটি এই সংঘাতের অন্যতম চালিকাশক্তি।
বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাকে কেন লক্ষ্যবস্তু করছে হুতিরা? সৌদি আরবের প্রচলিত সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়ার পরিবর্তে দেশটির অর্থনীতিতে ক্ষতি করা এবং স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত করার কৌশল নিয়েছে হুতিরা। সৌদি আরবের অর্থনীতির জন্য বিমানবন্দর, তেলের পাইপলাইন, শোধনাগার ও জ্বালানি রফতানির টার্মিনাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব স্থাপনায় হামলা হলে উড়োজাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে, নিরাপত্তা ব্যয় বাড়তে পারে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে এবং জ্বালানি রপ্তানিও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
গত ১০ অক্টোবরের প্রাণঘাতী হামলার পর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। বিমানবন্দরটি বন্ধ রাখা এবং পরবর্তী সময়ে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ সৌদি আরবের জন্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। শনিবার হুতিরা দাবি করে, তারা বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ইয়ানবু ও রাবিগের আশপাশের স্থাপনা এবং ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনও রয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। তবে হুতিদের দাবি করা হামলাগুলোতে প্রকৃতপক্ষে কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, হামলা সফল না হলেও তা প্রতিহত করতে সৌদি আরবকে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় রাখতে হয়। একই সঙ্গে নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন স্থাপনায় সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হতে পারে। ফলে সরাসরি ক্ষয়ক্ষতি না হলেও অর্থনীতি ও স্বাভাবিক কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ কীভাবে সংঘাতের চিত্র বদলে দিয়েছে? যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৃহত্তর যুদ্ধ হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব পশ্চিমাঞ্চলের তেল অবকাঠামো এবং লোহিত সাগর দিয়ে জ্বালানি রফতানির পথের ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে। ফলে ইয়ানবুর আশপাশের স্থাপনা এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালির নৌপথ দেশটির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই নৌপথ ও স্থাপনাগুলোকে হুমকির মুখে ফেলে হুতিরা উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রফতানি স্বাভাবিক রাখার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে ইরানের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগও তৈরি হতে পারে। রয়টার্সের বরাতে আঞ্চলিক সূত্রগুলো বলেছে, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগানোও এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে। তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, হুতিদের প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্ত সরাসরি তেহরান থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়, এমন ধারণা করার যথেষ্ট ভিত্তি নেই।