সেপ্টেম্বর ২০২৫। সৌদি আরবের কারাগারে চার মিসরীয় বন্দী শুনলেন, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নাকি তাঁদের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন; মামলা নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে। কারা কর্তৃপক্ষই তাঁদের এ আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু এর অল্প সময় পরই, কোনো আগাম খবর ছাড়া, চারজনেরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
বাংলাদেশের পাঠকের কাছে এ চিত্র এখন ভালোভাবেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড সম্প্রতি কার্যকর হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের (ইএসওএইচআর)’ হিসাবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এ দুজন সেই হিসাবের বাইরে। ওই ছয় মাসে কত বাংলাদেশির সাজা কার্যকর হয়েছে, তা জানা যায়নি।
সৌদি আরব বহু বছর ধরেই বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা দেশগুলোর একটি। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো এবারও দেশটি বৈশ্বিক তালিকার শীর্ষে। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, কোন আইনে, কার বিবেচনায় আর কেমন আদালতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড ঠিক হয়? আর যুবরাজের বারবার দেওয়া সংস্কারের আশ্বাসই–বা গেল কোথায়? খোঁজা যাক সে উত্তর:
২০২৫ সালে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে রেকর্ড ৩৫৬টি। এক বছর আগে, ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫, যা তখন ছিল গত এক দশকের সর্বোচ্চ। ২০১৮ সালে, অর্থাৎ মোহাম্মদ বিন সালমান যুবরাজ হওয়ার পরের বছর, কার্যকর হয়েছিল ১৪৯টি; ২০২৪ সালের সংখ্যা তার দ্বিগুণের বেশি। ২০১৪ সালের ৯০টির তুলনায় এটি প্রায় গুণ।
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ১৮০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। অ্যামনেস্টি তখনই সতর্ক করেছিল, ওই গতিতে চললে বছরের মোট সংখ্যা ২০২৪ সালের রেকর্ডের কাছাকাছি দাঁড়াতে পারে। বছর শেষে ৩৫৬ সংখ্যাটি সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে মোট ১ হাজার ৮১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাঁদের প্রায় প্রতি তিনজনের একজনের সাজা হয়েছে শুধু মাদকসংক্রান্ত অপরাধে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি।
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইএসওএইচআর অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড রেকর্ড করেছে। সংস্থাটির হিসাবে বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে মোট কার্যকর করা মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা ২ হাজারে পৌঁছেছে। পূর্ববর্তী যেকোনো শাসনামলের তুলনায় এটি রেকর্ড।
সৌদি আরবে সব অপরাধ ও শাস্তি নির্ধারণ করে, এমন একটি পূর্ণাঙ্গ দণ্ডবিধি নেই। কোনটি অপরাধ, আর তার শাস্তি কী হবে, তা ঠিক করার ব্যাপক ক্ষমতা পান বিচারকেরা। তাঁরা এটি করেন ইসলামি আইন (শরিয়াহ) ও ফিকহের (শরিয়াহর বিধানগুলোর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ সম্পর্কে ইসলামি আইনবিদদের বোঝাপড়া) নিজস্ব ব্যাখ্যায়। দেশটির শাসনব্যবস্থা অনুযায়ী, যেকোনো আইনের চূড়ান্ত উৎস পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ।
ইসলামি আইনে অপরাধ তিন ভাগে বিভক্ত: হদ, কিসাস ও তাজির। হদ ও কিসাস—এ দুই শ্রেণির অপরাধে শাস্তি নির্ধারিত; এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ডও আছে। হদ নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি; যেমন কিছু ক্ষেত্রে চুরি, ব্যভিচার ও মদ্যপান। কিসাস প্রযোজ্য হয় প্রধানত খুন বা শারীরিক আঘাতের ক্ষেত্রে, প্রতিশোধমূলক শাস্তি হিসেবে। নির্দিষ্ট শর্তে ভুক্তভোগী বা নিহত ব্যক্তির স্বজনেরা এ ক্ষেত্রে ক্ষমা করতে বা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে পারেন। তৃতীয় শ্রেণি তাজির এমন অপরাধ, যার শাস্তি হদ বা কিসাসে নির্ধারিত নেই। জনশৃঙ্খলা ও সমাজের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে, এমন সব কাজ এর আওতায় পড়ে। এখানে শাস্তি কী হবে, তা ঠিক করেন বিচারক নিজে।
মৃত্যুদণ্ডের রায়ে শরিয়াহর নির্ধারিত বিধান আর তাজিরের বিবেচনামূলক সিদ্ধান্ত মিলেমিশে থাকে। সবচেয়ে কঠোর ও অপূরণীয় শাস্তি হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুদণ্ড এখানে বিচারকের বিবেচনার ওপরই ছাড়া। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, তাজিরের আওতায় মৃত্যুদণ্ড ‘কদাচিৎ প্রয়োগ হয়’। তবে মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান ভিন্ন ছবি দেখায়।
কিছু লিখিত আইনেও নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং ২০০৫ সালের মাদকবিরোধী আইন প্রধান। মাদকবিরোধী আইনে কয়েকটি অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডকে মূল শাস্তি হিসেবেই রাখা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অস্পষ্ট ধারায় ‘জাতীয় ঐক্য বিপন্ন করা’র মতো অভিযোগেও লোকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যেসব অপরাধের শাস্তি কোনো আইনে নির্ধারিত নেই, সেখানে বিচারকেরা ফিরে যান শরিয়াহর ব্যাখ্যায়।
মৃত্যুদণ্ডের তালিকাও দীর্ঘ। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, শুধু খুন নয়; অস্ত্রের মুখে ডাকাতি, অপহরণ বা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত খুনেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। এর বাইরে রাষ্ট্রদ্রোহ, ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকিনীবিদ্যা ও জাদুটোনা, ডাকাতি, নির্যাতন এবং খুনের চেষ্টার মতো অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়। মাদকের ক্ষেত্রে পাচার, দখলে রাখা, বিতরণ এমনকি সেবন পর্যন্ত এর আওতায়।
তবে আন্তর্জাতিক আইনে মৃত্যুদণ্ড শুধু ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেমন ইচ্ছাকৃত হত্যা। সৌদি সরকার জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দলকে বলেছে, তারা শুধু ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধে’ই মৃত্যুদণ্ড দেয়।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি কর্তৃপক্ষ ‘বিবেচনামূলক শাস্তির দণ্ডবিধি’ (পেনাল কোড ফর ডিসক্রিশনারি স্যাঙ্কশনস) নামে একটি নতুন আইনের খসড়ার ঘোষণা দেয়, যাতে তাজিরের অপরাধগুলো লিখিত রূপ পাবে। ফাঁস হওয়া খসড়া বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি বলছে, এতে মৃত্যুদণ্ড সীমিত হওয়ার বদলে আরও পাকাপোক্ত হচ্ছে। খসড়ায় খুন, ধর্ষণ, ‘ধর্মদ্রোহ’ ও ‘ধর্মত্যাগ’-এর অভিযোগে বিচারকেরা মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবেন। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো পাস বা কার্যকর করা হয়নি।
দেশের সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’। এর সদস্য ১১ জন, প্রধান হন বিচারমন্ত্রী। বাদশাহ নবায়নযোগ্য চার বছরের মেয়াদে সদস্য নিয়োগ দেন। ২০০৭ সালের ‘বিচারব্যবস্থা-আইন’ অনুযায়ী এ পর্ষদ আদালত ও বিচারকদের কাজ তদারক করে। আর মৃত্যুদণ্ড, অঙ্গচ্ছেদ, পাথর ছুড়ে হত্যা কিংবা কিসাসের রায় পর্যালোচনার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের।
আইনে বিচারকদের স্বাধীনতার কথা বলা আছে, কিন্তু অ্যামনেস্টির মূল্যায়নে বিচারকেরা কার্যত নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণেই থাকেন। বিচারক নিয়োগ হন রাজকীয় আদেশে। বিচারক পুরুষ হতে হবে—এমন কথা আইনে স্পষ্ট করে লেখা নেই; তবে দেশের সব বিচারকই পুরুষ।
সরকারি কৌঁসুলি দপ্তর ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী—দুটিই সরাসরি বাদশাহ ও যুবরাজের কাছে জবাবদিহি করে। সৌদি গবেষক আবদুল্লাহ আলাউদের ভাষ্য, যুবরাজ বিচারব্যবস্থাকে নিজের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানিয়েছেন। এ জন্য প্রসিকিউশনের ক্ষমতা (রাষ্ট্রীয়ভাবে মামলা তদন্ত ও আসামিকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রশাসনিক ও আইনি ক্ষমতা) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়েছেন রাজদরবারে। এ ছাড়া বিচারাঙ্গনে প্রভাব খাটাতে পারে, এমন সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়েছেন, আদালতজুড়ে বসিয়েছেন অনুগতদের।
অ্যামনেস্টির মতে, বিচারকদের ব্যাপক বিবেচনাক্ষমতা আর বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার অভাবের সুযোগে কর্তৃপক্ষ আদালতকে ব্যবহার করে সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতির সমালোচকদের শাস্তি দিতে পেরেছে।
আসামিদের অধিকার অবশ্য কাগজে আছে। ২০১৩ সালের নভেম্বরে রাজকীয় ফরমানে জারি হওয়া ফৌজদারি কার্যবিধি আইনে তদন্ত ও বিচার—দুই পর্যায়েই আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার আছে। আসামিদের ওপর নির্যাতন ও তাঁদের সঙ্গে অন্যান্য দুর্ব্যবহার করা নিষিদ্ধ, বিচারপূর্ব আটকের সময়সীমা বাঁধা, দীর্ঘ আটকে বিচারিক পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক, আর মৃত্যুদণ্ডসহ সব রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে। বাস্তবে, অ্যামনেস্টির ভাষ্য, মৃত্যুদণ্ডের মামলাতেও আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে মানা হয়নি।
যেসব মামলায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক অভিযোগ থাকে, সেগুলো যায় বিশেষায়িত ফৌজদারি আদালতে। এ আদালত সম্পর্কে জাতিসংঘের যথেচ্ছ আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের মত, একে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনাল বলা যায় না।
২০১৮ সাল থেকে সৌদি কর্তৃপক্ষ একাধিকবার মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অ্যামনেস্টির পর্যবেক্ষণ, প্রতিবারই তারা হয় পিছু হটেছে, নয়তো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন করেনি। ২০২২ সালের ৩ মার্চ ‘দ্য আটলান্টিক’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যুবরাজ বলেছিলেন, একটিমাত্র শ্রেণি বাদে মৃত্যুদণ্ডের বাকি সবকিছুই তাঁরা তুলে দেবেন।