জার্মানিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শনিবার সন্ধ্যায় বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। পুলিশ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পানি ছোড়া কামান ব্যবহার করেছে এবং মুখোশধারী দাঙ্গাবাজরা দোকানের জানালা ভাঙচুর করেছে। কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের আয়োজিত এই বিক্ষোভে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো অনুপ্রবেশ করেছে।
‘জেন জি হ্যাজ গট দিস!’ আন্দোলনের ডাকে সারা জার্মানিতে শনিবার বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীরা উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষায় কম বিনিয়োগ, পরিবেশগত উদ্বেগ এবং বাধ্যতামূলক সামরিক চাকরি পুনর্বহালের সম্ভাবনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। এর আগে ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অনুরূপ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্সে টানা তৃতীয় সপ্তাহান্তে বিক্ষোভে অস্থিরতা দেখা যায়।
আয়োজকরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের আহ্বান জানালেও জার্মানির কিছু শহরে, বিশেষ করে ফ্রাঙ্কফুর্ট ও কোলোনে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ পানি ছোড়া কামান ব্যবহার করে এবং মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা দোকানের জানালা ভাঙচুর করে।
জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোবরিন্ডট ট্যাবলয়েড বিল্ডকে বলেন, “সহিংস বামপন্থী গোষ্ঠী এবং অভিবাসী সম্প্রদায়ের দাঙ্গাবাজরা” শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে জিম্মি করেছে। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
ফ্রাঙ্কফুর্টসহ হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করেন যে সন্ধ্যার পর সহিংসতা ও লুটপাটে জড়িয়ে পড়ার সময় “প্রায় ১০০ জন স্পষ্টভাবে চিহ্নিত বামপন্থী উগ্রবাদী” শহরের বিক্ষোভে অনুপ্রবেশ করেছিল। রোমান পোসেক বলেন, “ফ্রাঙ্কফুর্টে এই ইভেন্টটি কীভাবে শেষ হলো তা লজ্জাজনক।”
পোসেক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে ফ্রান্সে যে সহিংসতা দেখা গেছে তা জার্মানিতে পুনরাবৃত্তি হবে না। তিনি বলেন, “ফ্রান্সের تلك ছবিগুলো আমাদের সবার মনে আছে — লুটপাট, জ্বলন্ত বাড়ি, জ্বলন্ত পুলিশের গাড়ি এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা। এই বিষয়ে ফ্রান্সকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।”
ফ্রাঙ্কফুর্টে পুলিশ জানায়, জরুরি কর্মীদের ওপর মলোটভ ককটেল নিক্ষেপ করা হয় এবং দোকানের জানালা ভাঙচুর করা হয়। একটি বন্দুকের দোকানের জানালা ভাঙার পর পুলিশ একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে এবং দুটি অস্ত্র জব্দ করে। জার্মান সংবাদপত্র ডের স্পিগেলের মতে, ফ্রাঙ্কফুর্টের ডাউনটাউনে কয়েকজন দোকানে ঢুকে পড়ে এবং রাত পর্যন্ত ৩০ জনেরও বেশি মানুষকে সাময়িক আটক করা হয়।
কোলোন পুলিশ জানায়, শহরের কেন্দ্রে মিছিলের সময় কিছু বিক্ষোভকারী আতশবাজি ছোড়ার পর পানি ছোড়া কামান ব্যবহার করা হয়। পুলিশ এক বিবৃতিতে বলে, “আমাদের পদক্ষেপ দাঙ্গাবাজ ও সহিংস ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে — শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে নয়।”
হামবুর্গে ব্যারিকেডে আগুন দেওয়া এবং জরুরি সেবা কর্মীদের ওপর হামলার পর দাঙ্গা পুলিশ সাড়া দেয়। পুলিশ জানায়, “জরুরি কর্মীদের ওপর পাইরোটেকনিক্স ও নির্মাণসামগ্রী নিক্ষেপের ঘটনা বেড়েছে … আমাদের দাঙ্গা পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে।”
বার্লিন পুলিশ এক্স-এ লিখেছে যে জার্মানির রাজধানীতে ২৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা সামান্য আহত হয়েছেন এবং সম্পত্তির ক্ষতি, হামলা ও জরুরি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধসহ বিভিন্ন অপরাধে প্রায় ৬০ জনকে আটক করা হয়েছে।
আন্দোলনের আয়োজকরা পরবর্তী সহিংসতা থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। ডের স্পিগেলের বরাত দিয়ে তাদের প্রেস টিমের এক মুখপাত্র বলেন, “বিক্ষোভ শেষ হওয়ার পর কী ঘটেছে তা আমাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না।”
‘জেন জি হ্যাজ গট দিস!’ এর আয়োজকরা সর্বোচ্চ উপস্থিতি ও দৃশ্যমানতার জন্য হ্যালোইনের সাথে মিল রেখে এই দিনটির পরিকল্পনা করেছিল। সংস্থার মতে, শনিবার সারা জার্মানিতে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।
আন্দোলনের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, “আমরা তরুণরা আর আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া দেখতে চাই না।”
মিউনিখে ১৮ বছর বয়সী এক ছাত্র বিক্ষোভকারী রয়টার্সকে বলেন, “সরকার আমাদের উদ্বেগের কোনো জবাব দেয়নি, বরং ব্যয় সংকোচন ও আরও বোঝা চাপিয়ে চলেছে।” পূর্বাঞ্চলীয় শহর ড্রেসডেনে বিক্ষোভকারীরা প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাঁটেন যাতে লেখা ছিল, “ধনীরা যুদ্ধ চায়, তরুণরা ভবিষ্যৎ চায়!” এবং “তোমরা সব নষ্ট করেছ — জেন জি ঠিক করে নেবে।”
এদিকে ফ্রান্সে শনিবার ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের আরও জাতীয় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়, যা ১৭ ও ২৪ অক্টোবরের বিক্ষোভের পর তৃতীয় দফা হিসেবে চিহ্নিত। তবে এবার বিক্ষোভের মাত্রা আগের চেয়ে কম ছিল। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, শনিবার সারা দেশে ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন, প্যারিসে ৭০ হাজার। ১৭ অক্টোবর ৫ লাখ ৫০ হাজার এবং গত সপ্তাহে ৪ লাখ ১০ হাজার বিক্ষোভকারী অংশ নিয়েছিলেন।
ফরাসি বিক্ষোভ বেশিরভাগই শান্তিপূর্ণ ছিল, কিছু ঘটনা ছাড়া। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, বোর্দো, তুলুজ, রেনেস, লিল, নঁত, মার্সেই এবং লিয়ঁসহ কয়েকটি শহরে “মিছিলের শেষভাগে উগ্র উপাদানগুলো” “ক্ষতি ও লুটপাটের উদ্দেশ্যে শহরের কেন্দ্রে ঢোকার চেষ্টা করে।”
শনিবার পর্তুগাল ও ইতালিতেও বাড়তি আবাসন ব্যয়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে হাজার হাজার মানুষ মার্চ করে এবং সরকারের একটি ভাড়া বিল প্রত্যাহারের দাবি জানায়, যা তাদের মতে দেশের আবাসন সংকট আরও বাড়িয়ে দেবে। ইতালিতে মূলত শিক্ষার্থী গোষ্ঠী ও শ্রমিকদের নেতৃত্বে তুরিন, বোলোনিয়া ও মিলানসহ বিভিন্ন শহরে মুদ্রাস্ফীতি, স্থবির মজুরি ও অপরিশোধযোগ্য আবাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়।
সিএনএনের পিয়েরে পি ব্যারিন প্রতিবেদনে সহায়তা করেছেন।