Deleted
প্রকাশ : Sep 27, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ও তরুণদের সম্পৃক্ততাই বদলে দেবে অর্থনীতি

খাদ্য নিরাপত্তা এখনো দেশের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। এক সময় পাটের মতো অর্থকরি ফসল কৃষি অর্থনীতিকে প্রভাবিত করলেও এখন কৃষি মূলত বাড়তে থাকা জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণে নিবদ্ধ। চলমান অর্থনৈতিক সংকটে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির দিকে। জনসংখ্যা বাড়ার সাথে খাদ্যের চাহিদা বাড়লেও নানাবিধ কারণে কৃষিজমির পরিমাণ ও উর্বরতা কমছে।

এ বাস্তবতায় উৎপাদন বাড়াতে ও খরচ কমাতে উন্নত কৃষিবীজ এবং আধুনিক যান্ত্রিক কৃষিকৌশল গ্রহণের বিকল্প নেই। বিশেষত হাওরাঞ্চলের বড় কৃষিফার্মের পাশাপাশি সারা দেশে ক্ষুদ্র ও খণ্ডিত খামার ও বাগানে উৎপাদন সহজ করতে আধুনিক কৃষিযন্ত্র আমদানি, উদ্ভাবন ও বিপণন জোরদার করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ থাকতে হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধানকাটার মৌসুম শুরুর আগেই হাওরাঞ্চলে উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল বা আকস্মিক বন্যার আশঙ্কায় কৃষকদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এ সমস্যা উত্তরণে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো অপরিহার্য। সরকার কৃষির আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণের কথা বললেও বাস্তব প্রতিফলন অপ্রতুল।

জমি চাষ, বীজ বপন, চারা রোপণ, সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, আগাছা দমনসহ প্রতিটি স্তরেই কৃষিশ্রমিকের প্রয়োজন হয়। বর্ধিত মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে উৎপাদন খরচ ও কৃষিশ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। একই সময়ে ফসল তুলতে ও বুনতে একসাথে বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের অভাব দেখা দেয়। তাই উৎপাদন খরচ কমাতে কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।

গত পাঁচ দশকে দেশের কৃষি গবেষকরা উচ্চফলনশীল বীজ ও নতুন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব এনেছেন। তাই কৃষিপ্রযুক্তি ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কৃষিযন্ত্র সুলভ ও সহজলভ্য করতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও কার্যকর উদ্যোগ দরকার। ডিজিটালাইজেশনের যুগে ফসল বোনা ও কাটার জন্য আধুনিক যন্ত্র উদ্ভাবন বা আমদানি করা জরুরি। হাওরাঞ্চলে বড় যন্ত্র ব্যবহার হলেও ছোট জমিতে তা চলে না। এ ক্ষেত্রে বুয়েট বা চীনের সহযোগিতায় কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবন ও আমদানি করা যেতে পারে। এলাকাভিত্তিক সমবায় পদ্ধতিতে আধুনিক যন্ত্র বা হারভেস্টর ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগকে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে হবে। মূলধারার কৃষি, ফলবাগান, মৎস্যচাষ, পোল্ট্রিশিল্প, ডেইরি ও লাইভস্টক খাতের উন্নয়নে প্রতিটি ধাপে আধুনিক প্রযুক্তি ও যান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

শহরে রিকশা চালনাকে সহজ জীবিকা হিসেবে বেছে নেওয়ায় গ্রামে মারাত্মক কৃষিশ্রমিক সংকট তৈরি হচ্ছে, যা ফসল উৎপাদন ব্যাহত করে সামগ্রিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম শিল্পসংযুক্ত না হওয়ায় অনেক তরুণ কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। মেধাবী শিক্ষার্থীদের দক্ষতা কাজে লাগানোর সক্ষমতা অর্থনৈতিক কাঠামোতে নেই। এ দ্বিমুখী সংকটে অভ্যন্তরীণ জনমিতিক লভ্যাংশ আদায়ের সুযোগ নষ্ট হচ্ছে এবং মেধাবীরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থান নেই। তরুণ প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য অংশকে কৃষিকাজে লাগানো গেলে কৃষি অর্থনীতির জন্য তা ইতিবাচক হবে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশের কর্মসংস্থানে কৃষির অবদান ছিল ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ। আট বছরে তা বেড়ে ৪৫ শতাংশ হয়েছে। বিপরীতে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমে ২০ দশমিক ৪২ থেকে ১৭ দশমিক ৩৬ শতাংশে নেমেছে। এটি অর্থনীতির কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রকাশ। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৬-২২ সালে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন। তাদের মধ্যে মাত্র ৮৭ লাখ চাকরি পেয়েছেন। অর্থাৎ ৫৩ লাখ তরুণ এখনো বেকার। যারা কাজ পেয়েছেন তাদের ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে মজুরি ও উৎপাদনশীলতা অত্যন্ত কম।

কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও কৃষিকে পূর্ণাঙ্গভাবে শিল্পায়িত করতে না পারায় এ খাতে লাভ অনিশ্চিত। ধান, পাট বা সাধারণ ফসলে বিনিয়োগের অর্থ ফিরে আসার পরিমাণ নগণ্য। আবহাওয়া, সরবরাহ ও কাঠামোগত সমস্যায় এ পেশা ঝুঁকিপূর্ণ। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষায়িত অধ্যয়নের পরও উপযুক্ত গবেষণা ও প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ হচ্ছে না। এ পেশায় সামাজিক মর্যাদার অভাবও রয়েছে। স্নাতক সম্পন্ন তরুণ নিজেকে কৃষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বোধ করেন না। দক্ষতার স্বল্পতাও বড় কারণ; আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, বাজার বিশ্লেষণ ও ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষায় শেখানো হয় না।

কৃষিনির্ভর অর্থনীতি হলেও শিল্প খাতের প্রসার ও উন্নয়ন জরুরি। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এ সময়ে জনসম্পদ ব্যবহার করে শিল্প অগ্রগতি নিশ্চিত করাই ভবিষ্যতে সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ার চাবিকাঠি। একজন প্রতিভাবান তরুণ, যার কোটা নেই বা যিনি শহরের বাইরে থাকেন, তিনি চাকরি পান না। এটি গুণীদের বিদেশে পাড়ি দিতে বাধ্য করে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড দক্ষতাভিত্তিক অভিবাসন নীতি অনুসরণ করে সেরা মস্তিষ্ক আকৃষ্ট করছে। আমরা কেন নিজস্ব প্রতিভা ধরে রাখতে পারি না? সরকারি খাতে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক নিয়োগ হলে বেসরকারি খাতও তা অনুসরণ করবে। এটি শক্তিশালী বার্তা দেবে যে যোগ্যতাই একমাত্র মানদণ্ড।

সরকারকে বুঝতে হবে জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ শেষ হয়ে আসছে। আজকের যুবকরা কর্মসংস্থান না পেলে আগামী দশকে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে গভীর অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে। বেকারত্বের ফলে সামাজিক অশান্তিও অনিবার্য। তাই সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিক্ষা কারিকুলাম দ্রুত পরিবর্তন, অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ছোট-মাঝারি উদ্যোগে সহজ ঋণ প্রদান অবিলম্বে করতে হবে। বিলম্ব করলে লাখ লাখ তরুণ হতাশা ও দারিদ্র্যের শিকার হবে।

লেখক: বাজার বিশ্লেষক ও অর্থ ব্যবস্থাপনা পরামর্শক; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, গোল্ড বেল গ্রুপ।

(বাংলাভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষের নয়।)

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

টঙ্গীতে ওষুধ কারখানায় আগুন: উৎপাদন বন্ধ, গণমাধ্যমকে তথ্য দি

1

বাংলামোটরে এনসিপির কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ

2

ঢাকায় হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা, ৩ নদীবন্দরে সতর্কতা জারি

3

নিরপেক্ষতার কঠোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলো সুইজারল্যান্ড, ভ

4

সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের দাবি ক্যাবের

5

নরসিংদীতে বাবার বিরুদ্ধে ছেলেকে হত্যার অভিযোগ

6

সিক্স ফ্ল্যাগসে রোলারকোস্টার দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু, তদন্ত

7

আইসিসির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা 'অগ্রহণযোগ্য': নোবেল শান্তি প

8

মিরপুরে জাহাঙ্গীরের সম্পদ সাম্রাজ্য এখন কার দখলে?

9

দিল্লিতে বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তার সিজেপির শৌরভ দাস ও আশুতোষ

10

নেপালের প্রধানমন্ত্রীর হিমালয় জলবায়ু সহযোগিতা প্রস্তাব

11

নতুন বছরের শুরুতেই যেসব ফোনে বন্ধ হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ

12

১৪ দিনের দাওয়াতি সফরে যুক্তরাষ্ট্রে চরমোনাই পীর

13

৪৪ বছর পর সিঁড়ির ফাঁকে মিললো ১৯৮২ সালের চিঠি

14

বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান কোনো ভেদাভেদ নেই: স

15

অগ্নিকাণ্ডের ৫ দিন পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ

16

সৌদি জোটের হামলার জবাবে আরামকোতে হুথি হামলা, রাজধানীতে ক্ষেপ

17

সারের ডিলারশিপে দুর্নীতির অভিযোগ, জামায়াতের ছয় দাবি

18

প্রতি তিন মাসে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অগ্রগতি জানতে চান প্রধানম

19

মাস্কের ডোজের নথি চেয়ে মামলা, শুনবে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট

20