দেশের বিচারিক আদালতগুলোতে মাদক মামলার জট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ৪ লাখ ২৬ হাজার ১১০টি মাদক মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৬ হাজার ২০০টি, যা মোট মামলার ৩.৮০ শতাংশ। বর্তমানে ৪ লাখ ৩ হাজার ৯০৮টি মামলা বিচারাধীন, যা মোট মামলার প্রায় ৯৪.৭৯ শতাংশ।
গত ১৮ আগস্ট ২০২৫ তারিখে বিদেশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তরিকুল ইসলাম (৩৭) নামে এক মাদক পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। গ্রেপ্তারের ৩১ ঘণ্টার মধ্যে তিনি জামিন পেয়ে যান। এ ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয় এবং অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বিস্মিত হন।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গুলশানের মাদানী অ্যাভিনিউ থেকে গ্রেপ্তার হওয়া তরিকুল আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের সদস্য। তার দেওয়া তথ্যে ঢাকার গ্রিন রোডের বাইতুল লাজ ভবনের চতুর্থ তলা থেকে প্রায় দেড় লাখ ট্রামাডল বড়ি উদ্ধার করা হয়। ট্রামাডল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের তফসিলে ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত মাদক, যার জন্য ১ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তরিকুল নিজেই ট্রামাডল বিদেশে নিয়ে যেতেন। এ জন্য ভিসা করাতে তিনি একটি দেশের দূতাবাসে গিয়েছিলেন। পরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গোয়েন্দা তথ্য পায় এবং তাকে গ্রেপ্তার করে।
২১ আগস্ট গণমাধ্যমে জামিনের খবর প্রচারের পর ২৪ আগস্ট আদালত জানায়, জামিনের আদেশটি ‘অন্যায্য ও বেআইনি’ ছিল। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. জাকির হোসেন তরিকুলসহ দুই আসামির জামিন বাতিলের আদেশ দেন। আদালত বলেন, আসামি তরিকুল ইসলাম ও উজ্জ্বল মিয়াকে জামিন দেওয়ার আদেশটি তড়িঘড়ি, পক্ষপাতমূলক ও অন্যায্য ছিল। মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় ম্যাজিস্ট্রেট ভুলভাবে জামিনের আদেশ দিয়েছেন, যা বাতিল করা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখার এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, মাদক উদ্ধারের পর পরীক্ষা করে প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই মামলা ও জব্দ তালিকা করা হয়েছিল। এরপরও তরিকুল জামিন পেয়ে যান, যদিও জামিন দেওয়া আদালতের এখতিয়ার। তিনি আরও বলেন, নতুন মাদক মামলায় তরিকুল আবার গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং এখন কারাগারে আছেন। অপ্রচলিত মাদক ট্রামাডল নিয়ে ধরা পড়া তরিকুল বিচার বিভাগে কর্মরত পরিবারের এক সদস্যের সহযোগিতায় জামিন পেয়েছিলেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
সারা দেশে প্রতিদিনই মাদক মামলায় শতাধিক আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছেন, তাদের অনেকে জামিনে বেরিয়ে আবার মাদক কারবারে জড়াচ্ছেন। সূত্র বলছে, দেশের মোট মাদক মামলার প্রায় ৯৫ শতাংশ বিচারাধীন ও অমীমাংসিত। বিচারিক প্রক্রিয়ার ধীরগতি ও নানা জটিলতায় সারা দেশের আদালতে ৮৬ হাজার মামলা ঝুলে আছে। বিপুলসংখ্যক মামলা দীর্ঘদিন বিচারাধীন থাকায় তদন্তের মান, প্রমাণ সংগ্রহ ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আইনজীবীরা।
তারা বলছেন, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন করেছে, কিন্তু মামলা প্রতিদিন জমছে; যে হারে মামলা জমছে সে হারে নিষ্পত্তি হচ্ছে না। মামলার ফায়সালা দ্রুত না হলে অপরাধীরা পার পাচ্ছে এবং নিরপরাধরা অনিশ্চয়তায় থাকছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিদিন আসামি ধরা হচ্ছে, কিন্তু অনেকে সহজেই জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে। জামিননামার কপি পৌঁছানোর আগেই অনেক আসামি লাপাত্তা হচ্ছে। জামিন অযোগ্য অপরাধ সত্ত্বেও আসামিরা সহজে জামিন পেলে মাদক নির্মূল করা কঠিন হবে।
সুপ্রিম কোর্ট থেকে সংগ্রহ করা তথ্যানুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার বিচারিক আদালতে নির্ধারিত ত্রৈমাসিক মেয়াদে মোট মাদক মামলার সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ২৬ হাজার ১১০টি। এর মধ্যে আগের মেয়াদ থেকে স্থানান্তরিত ৪ লাখ ৬ হাজার ১৪৭টি, নতুন দায়েরকৃত ১ হাজার ১৭৬টি এবং অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত ১৮ হাজার ৭৮৭টি। এই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৬ হাজার ২০০টি মামলা, যা মোটের ৩.৮০ শতাংশ। ৬ হাজার ২টি মামলা বিচারিক প্রয়োজনে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে।
দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে মাদক মামলার চাপ সবচেয়ে বেশি। ঢাকা বিভাগে মোট ১ লাখ ২০ হাজার ২২৬টি মামলার বিপরীতে বিচারাধীন ১ লাখ ১২ হাজার ৫৫৭টি এবং নিষ্পত্তি হয়েছে ৫ হাজার ২০০টি। চট্টগ্রাম বিভাগে মোট ৯৯ হাজার ১১৪টি মামলার মধ্যে অমীমাংসিত ৯৬ হাজার ৫৭০টি এবং নিষ্পত্তি মাত্র ২ হাজার ৩৩১টি। এছাড়া রাজশাহী বিভাগে ৮৭ হাজার ৬৩৯টি, খুলনা বিভাগে ৪৫ হাজার ৮০১টি এবং রংপুর বিভাগে ৪৩ হাজার ৯৯টি মামলা ঝুলে আছে। সবচেয়ে কম মামলার চাপ সিলেট বিভাগে, যেখানে মোট ১০ হাজার ৪৬১টি মামলার মধ্যে বিচারাধীন ৯ হাজার ৮৬১টি।
জেলা ও ট্রাইব্যুনালভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা ট্রাইব্যুনালে সর্বোচ্চ ৪৩ হাজার ৭৬২টি মামলার মধ্যে ৪০ হাজার ৪৩১টি অমীমাংসিত। চট্টগ্রাম ট্রাইব্যুনালে ৪০ হাজার ৬৭৮টি মামলার বিপরীতে বিচারাধীন ৩৯ হাজার ৬৯০টি। রাজশাহী ট্রাইব্যুনালে ২৬ হাজার ৭৭৩টি মামলার মধ্যে ২৬ হাজার ৫৯টি বিচারাধীন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে ১৯ হাজার ১২৭টি, কক্সবাজারে ১৭ হাজার ৫১২টি এবং বগুড়ায় ১৪ হাজার ৮৯৫টি মাদক মামলা আটকে আছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ফাঁসি। আইনের ধারা ৪৬ অনুযায়ী মাদক অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য; ধারা ৪৭ অনুযায়ী আদালত সহজে জামিন দিতে পারবে না, যদি না আসামি নারী, শিশু বা শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়; ধারা ৪৮ ও ৫১ অনুযায়ী গুরুতর অপরাধের বিচার ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে ৮৫ হাজার ৯১১টি মাদক মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির মুখ দেখেনি, যা মোট মামলার প্রায় ২০.১৫ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদি জটে শীর্ষে ঢাকা বিভাগে ৩১ হাজার ৯৭৬টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৯ হাজার ১৩০টি মামলা পাঁচ বছর পার করেছে। জেলা ট্রাইব্যুনালের মধ্যে ঢাকা ট্রাইব্যুনালে ১৯ হাজার ৫২৩টি, কক্সবাজারে ১২ হাজার ৭৪৪টি এবং চট্টগ্রাম ট্রাইব্যুনালে ১০ হাজার ২৬টি মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত।
হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে নিম্ন আদালতে ২০৬টি মাদক মামলার বিচারপ্রক্রিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ আছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৮৯টি, রংপুর বিভাগে ৩২টি, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে ১১টি করে মামলা বিচারিক স্থবিরতায় পড়েছে। একক আদালত হিসেবে ঢাকা ট্রাইব্যুনালেই ৭৩টি মাদক মামলার বিচার কার্যক্রম হাইকোর্টের নির্দেশনায় বন্ধ রয়েছে।