জুমার নামাজের পর বসনিয়াকে বিদায় জানিয়ে সারায়েভো থেকে ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেবের উদ্দেশে রওনা হলাম। ঐতিহাসিক সম্রাট মসজিদে শুক্রবার, ৭ জুন ২০২৪ জুমার নামাজ আদায় করে ট্যাক্সি ডেকে বিমানবন্দরের পথ ধরলাম। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ, সরু অলিগলি আর সবুজ পাহাড়ের দৃশ্য পেরিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছালাম।
সারায়েভোর সৌন্দর্যে এক স্বতন্ত্র মাধুর্য রয়েছে—অটোমান ঐতিহ্য, মসজিদের মিনার আর ইউরোপীয় স্থাপত্যের মিশেলে গড়া এই শহরের পেছনে রয়েছে যুদ্ধ, অবরোধ ও মানুষের দুর্ভোগের ইতিহাস। বিদায়ের মুহূর্তে শহরটির প্রতি একধরনের মায়া অনুভব করলাম।
ক্রোয়েশিয়া এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৩৪৭ ধরে এক ঘণ্টার কম সময়ের আকাশযাত্রায় পৌঁছে গেলাম জাগরেবের ফ্রাঞ্জো তুদমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ক্রোয়েশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঞ্জো তুদমানের নামে বিমানবন্দরটির নামকরণ হলেও এটি জাগরেব বিমানবন্দর নামেও পরিচিত।
বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে শহরের দিকে যেতে যেতে চোখে পড়ল জাগরেবের ভিন্ন চরিত্র। সারায়েভো পাহাড়ের কোলে আশ্রয় নেওয়া ঐতিহাসিক নগরী হলেও জাগরেবের পরিচয় প্রশস্ত রাস্তা, সবুজ পার্ক, পুরোনো ইউরোপীয় স্থাপত্য এবং আধুনিক নগরজীবনের শান্ত সহাবস্থানে।
ক্রোয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি রাষ্ট্র, যার আয়তন প্রায় ৫৬ হাজার ৫৪২ বর্গকিলোমিটার এবং সরকারি মুদ্রা ইউরো। বলকান অঞ্চলে ও অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত এই পর্যটনপ্রধান দেশটি ১৯৯১ সালের ২৫ জুন যুগোস্লাভিয়া থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন হয়।
ভূগোলের মানচিত্রে ক্রোয়েশিয়া বলকানের অংশ হলেও ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নে অনেক ক্রোয়েশীয় নিজেদের মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপের অংশ হিসেবে দেখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এই দ্বিধার পেছনে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস, অটোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে সংঘাত, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় শাসনের উত্তরাধিকার এবং যুগোস্লাভিয়ার অভিজ্ঞতা।
পিৎজা ডেলিভারির কাজে প্রচুর ভারতীয় এবং কিছু বাংলাদেশি রয়েছেন। ক্রোয়েশিয়ায় আসতে সরকারি খরচের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয় যাঁদের মাধ্যমে আসেন, সেই এজেন্সিগুলোর চাহিদা মেটাতে। সরকারিভাবে কর্মসংস্থানের এই বিষয়গুলো দেখভাল করতে পারলে খরচ অনেক কম হতো।
শহরে পৌঁছে উঠলাম আগে থেকে বুক করা এয়ারবিএনবির অ্যাপার্টমেন্টে। কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন থেকে হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত বিঅ্যান্ডবি কনসেপ্ট নামের ছোট পরিসরের আবাসনটি ছিল পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও আরামদায়ক। হোটেলে ব্যাগ রেখে বেরিয়ে পড়লাম আশপাশটা দেখতে।
জাগরেবের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন শহরের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একটি স্থাপনা। উনিশ শতকে গড়ে ওঠা এই রেলযোগাযোগ কেবল যাতায়াতের মাধ্যম ছিল না; বরং নগরায়ণ, বাণিজ্য ও মানুষের চলাচলের নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছিল।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে সামনে তাকাতেই চোখে পড়ল বিস্তৃত সবুজ চত্বর, কিং টমিস্লাভ স্কয়ার। চত্বরের মাঝখানে ঘোড়ার পিঠে রাজা টমিস্লাভের মূর্তি এবং তার ওপারে হলুদাভ রঙের দৃষ্টিনন্দন আর্ট প্যাভিলিয়ন। এই চত্বরের সৌন্দর্যের বিশেষত্ব হলো এর উন্মুক্ত বিন্যাস।
স্টেশনের কাছেই বিখ্যাত হোটেল এসপ্লানেড। ১৯২৫ সালে উদ্বোধিত এই হোটেল নির্মিত হয়েছিল মূলত ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের যাত্রীদের বিলাসবহুল আবাসনের কথা মাথায় রেখে। প্যারিস–ভেনিস–ইস্তাম্বুল রুটের একটি পর্যায়ে জাগরেব গুরুত্বপূর্ণ স্টপেজ ছিল। আগাথা ক্রিস্টির বিখ্যাত গোয়েন্দা উপন্যাস ‘মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’ এই ট্রেনকে আরও পরিচিত করে তুলেছে।
পরদিন সকালেই বেরিয়ে পড়লাম জাগরেবকে পায়ে হেঁটে চেনার অভিযানে। ভ্রমণে আমার সবচেয়ে প্রিয় পদ্ধতি হলো হেঁটে শহর দেখা। হাঁটলে শহরকে অনুভব করা যায়—মানুষের কথাবার্তা, ক্যাফের কোলাহল, দোকানের সাজসজ্জা, ট্রামের শব্দ, রাস্তার গন্ধ—সবকিছু মিলিয়ে শহরের সঙ্গে গড়ে ওঠে এক ব্যক্তিগত সম্পর্ক।
জাগরেবকে মোটামুটি দুটি ঐতিহাসিক অংশে ভাগ করে দেখা যায়—আপার টাউন ও লোয়ার টাউন। লোয়ার টাউন অপেক্ষাকৃত সমতল; প্রশস্ত রাস্তা, বড় বড় চত্বর, সবুজ পার্ক, জাদুঘর এবং উনিশ ও বিশ শতকের ইউরোপীয় স্থাপত্যে সাজানো। অন্যদিকে আপার টাউন হলো পুরোনো জাগরেবের প্রাণ—সরু পাথরের রাস্তা, মধ্যযুগীয় প্রবেশপথ, পুরোনো গির্জা, সংসদ ভবন এবং উঁচু ঢালের ওপর গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক জনপদ।
হাঁটতে হাঁটতে লোয়ার টাউন থেকে এগিয়ে গেলাম আপার টাউনের দিকে। টিলা বেয়ে কিংবা সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে উঠতে মনে হলো, একই শহরের মধ্যে যেন দুটি আলাদা সময়ের বসবাস। নিচের শহরে আধুনিক নগরজীবনের গতি আর ওপরের শহরে ইতিহাসের ধীর পদচারণ।
ওপরের শহরে সেন্ট মার্ক্স স্কয়ারের নান্দনিকতায় চোখ আটকে গেল, বিশেষ করে সেন্ট মার্ক্স চার্চের রঙিন ছাদে। বিভিন্ন রঙের টালি দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ক্রোয়েশিয়ার ঐতিহাসিক প্রতীক ও জাগরেবের পরিচিত চিহ্ন। আশপাশেই ক্রোয়েশিয়া সংসদ ভবনসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো।
এরপর এগিয়ে গেলাম স্টোন গেটের দিকে। পুরোনো শহরের এই প্রবেশপথ জাগরেবের অন্যতম পরিচিত ঐতিহাসিক নিদর্শন। পাথরের পথ, পুরোনো দেয়াল আর চারপাশের স্থাপত্যের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, প্রতিটি বাঁক যেন শহরের অতীত ঐতিহ্যের স্মৃতি স্মারক।
কিন্তু আপার টাউনে আমার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছিল একটি জাদুঘরে—ভাঙা সম্পর্কের স্মৃতি জাদুঘর। Museum of Broken Relationships—জাদুঘরটির নাম শুনেই কৌতূহল জাগে। ইউরোপ হচ্ছে জাদুঘরে মহাদেশ। সাধারণত জাদুঘরে আমরা দেখি রাজা-বাদশাহদের স্মৃতিচিহ্ন, যুদ্ধের অস্ত্র, প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন কিংবা বিখ্যাত মানুষের ব্যবহৃত সামগ্রী; কিন্তু ভাঙা সম্পর্কের স্মৃতি নিয়ে একটি জাদুঘর! অভিনব আর চমকজাগানো বটে।
ভালোবাসার সম্পর্ক ভেঙে গেলে মানুষ কতভাবেই না সেই অতীতকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে। কেউ পুরোনো ছবি সরিয়ে রাখে, কেউ চিঠি ছিঁড়ে ফেলে, কেউ উপহার তুলে রাখে বহুদিন অগোচরে। আবার কোনো কোনো স্মৃতি এতটাই গভীরে গেঁথে থাকে যে সম্পর্ক শেষ হলেও তার রেশ থেকে যায় দীর্ঘকাল। এই জাদুঘরে মানুষের সেই ব্যক্তিগত স্মৃতিগুলোই জায়গা পেয়েছে।