‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস’ খ্যাত মার্কিন অভিনেত্রী ও উদ্যোক্তা জ্যাকলিন স্মিথের আজ ৮১তম জন্মদিন। ১৯৪৫ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের হিউস্টনে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর অভিনীত ‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস’ সিরিজটি ১৯৭৬ সালে শুরু হয়েছিল এবং এ বছর সিরিজটির পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হয়েছে।
ছোটবেলায় জ্যাকলিনের স্বপ্ন ছিল পেশাদার ব্যালে নৃত্যশিল্পী হওয়ার। মাত্র তিন বছর বয়সে নাচ শেখা শুরু করেন তিনি। টেক্সাসের ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মঞ্চের বিভিন্ন প্রযোজনায় অংশ নেন। এরপর নাচের স্বপ্ন নিয়ে নিউইয়র্কে পাড়ি জমান। সেখানেই তাঁর কর্মজীবন অন্যদিকে মোড় নেয় এবং বিজ্ঞাপনে কাজের সুযোগ পান। লিস্টারিন ও ব্রেক শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরে ‘ম্যাকক্লাউড’ ও ‘সুইচ’-এর মতো টেলিভিশন সিরিজে অভিনয় করেন।
‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস’-এর যাত্রা শুরু হয় টেলিভিশনে, ১৯৭৬ সালে। সেই মূল সিরিজেই কেলি গ্যারেট চরিত্রে অভিনয় করেন জ্যাকলিন। প্রধান তিন নারী চরিত্রে তাঁর সঙ্গী ছিলেন ফারাহ ফসেট ও কেট জ্যাকসন। অপরাধের তদন্তে নামা এই নারীদের অভিযান দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে সিরিজটিতে নারী চরিত্রের উপস্থাপন নিয়েও সমালোচনা ছিল। গ্ল্যামার ও পোশাককে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি আলোচনায় আসে নারীদের সাহসী, কর্মক্ষম চরিত্রে দেখানোর বিষয়টি।
মূল টেলিভিশন সিরিজটি চলে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত। সময়ের সঙ্গে প্রধান নারী অভিনয়শিল্পীদের তালিকা বদলেছে। কিন্তু শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঁচ মৌসুমেই ছিলেন জ্যাকলিন—শুরুর তিন ‘অ্যাঞ্জেল’-এর মধ্যে একমাত্র তিনিই। কেলি গ্যারেট হয়ে ওঠে তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে পরিচিত চরিত্র।
পরে নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে বড় পর্দায়ও ফিরে আসে ‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস’। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া একই নামের সিনেমায় অভিনয় করেন ক্যামেরন ডিয়াজ, ড্রু ব্যারিমোর ও লুসি লিউ। ২০০৩ সালে আসে সিকুয়েল ‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস: ফুল থ্রটল’। ২০১১ সালে নতুন করে টেলিভিশন সিরিজও তৈরি হয়, তবে তা এক মৌসুমেই শেষ হয়ে যায়। এরপর ২০১৯ সালে ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট, নাওমি স্কট ও এলা বালিনস্কাকে নিয়ে মুক্তি পায় আরেকটি ‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস’ সিনেমা। এই ফিরে আসার ইতিহাসে জ্যাকলিনও ছিলেন। ২০০৩ ও ২০১৯ সালের সিনেমায় কেলি গ্যারেট চরিত্রে সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি জানান দেন তিনি। পুরোনো সিরিজের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের অভিযানের যোগসূত্র হয়ে ওঠে তাঁর উপস্থিতি।
সিরিজ শেষ হওয়ার পর টেলিভিশন চলচ্চিত্র ও মিনিসিরিজে নিজের জায়গা তৈরি করেন জ্যাকলিন। ‘জ্যাকলিন বুভিয়ের কেনেডি’ টেলিভিশন চলচ্চিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্ট লেডির চরিত্রে অভিনয় তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য কাজ। এ অভিনয়ের জন্য ১৯৮২ সালে গোল্ডেন গ্লোবে মনোনয়ন পান। এরপর তাঁর কাজের তালিকায় যুক্ত হয় ‘রেজ অব অ্যাঞ্জেলস’, ‘জর্জ ওয়াশিংটন’ ও ‘দ্য বোর্ন আইডেনটিটি’র মতো মিনিসিরিজ। পরবর্তী সময়ে ‘দ্য ডিস্ট্রিক্ট’-এর মতো সিরিজেও অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের বাইরে উপস্থাপনা করেছেন হেয়ারস্টাইলিং প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান ‘শিয়ার জিনিয়াস’। জ্যাকলিনের কাজের তালিকায় রয়েছে পঞ্চাশের বেশি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনা।
পর্দায় জনপ্রিয়তার পর জ্যাকলিনের কর্মজীবনের আরেকটি বড় অধ্যায় শুরু হয় ১৯৮৫ সালে। মার্কিন খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান কেমার্টের সঙ্গে নারীদের পোশাক ও আনুষঙ্গিক পণ্যের সংগ্রহ বাজারে আনেন তিনি। তখন তারকাদের নিজস্ব ফ্যাশন ব্র্যান্ড আজকের মতো প্রচলিত ছিল না। সেই শুরুর দিকের সফল উদ্যোগগুলোর একটি হয়ে ওঠে তাঁর নামের পোশাকের সংগ্রহ।
পোশাকের পর ব্যবসার পরিধি বাড়ে ঘর সাজানোর সামগ্রী ও সুগন্ধিতে। জ্যাকলিনের আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ঘর সাজানোর কাপড় ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ নিয়ে ট্রেন্ড/ফ্যাব্রিকাটের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। পরের বছর কেমার্টে আসে বিছানা ও টয়লেট সাজসজ্জার পণ্যের সংগ্রহ।
২০০৮ সালে হেয়ারস্টাইলিস্ট হোসে এবার ও পলা ইয়ংয়ের সঙ্গে চালু করেন ‘স্টাইল বাই জ্যাকলিন স্মিথ’ হেয়ার ফ্যাশন উদ্যোগ। ২০১০ সালে স্বামী চিকিৎসক ব্র্যাড অ্যালেনের সঙ্গে ত্বকের যত্নের পণ্য নিয়েও কাজ করেন তিনি। এভাবে পোশাক থেকে ঘরের সাজ, চুলের ফ্যাশন থেকে ত্বকের পরিচর্যা—বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় তাঁর নাম। দশকের পর দশক পেরিয়েও ফ্যাশন ব্যবসার সঙ্গে জ্যাকলিনের সম্পর্ক রয়েছে। ২০২২ সালে এইচএসএনের সঙ্গে নতুন ব্যবসায়িক অধ্যায় শুরু করেন। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয়তালিকায় এখনো তাঁর নামের পোশাক রয়েছে।
এ বছর প্রকাশিত হয়েছে জ্যাকলিনের স্মৃতিকথা ‘আই ওয়ান্স নিউ আ গাই নেমড চার্লি’। সেখানে উঠে এসেছে ‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস’ তৈরির নেপথ্য, সহশিল্পীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং পর্দার বাইরের জীবন। নাচের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করা এক তরুণী কীভাবে অভিনেত্রী ও উদ্যোক্তা হয়ে উঠলেন, সেই পথচলাও রয়েছে বইটিতে। অক্টোবরে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জ্যাকলিন জানিয়েছেন, ৫০ বছর পরও সিরিজটি নিয়ে কথা বলতে হবে, এমনটা তাঁরা ভাবেননি। তাঁর আশা, সেই নারী গোয়েন্দাদের অভিযান দর্শকদের সাহসী ও স্বাধীন হতে উৎসাহ দিয়েছে।