Deleted
প্রকাশ : Oct 22, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ফররুখ আহমদের বিরুদ্ধে অসাধু সমালোচনার জবাব

পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই রাষ্ট্রভাষা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন তাঁর স্মৃতিকথায় জানান, ১৩৫০ সালের কার্তিক সংখ্যা মাসিক মোহাম্মদীতে আবুল মনসুর আহমদের গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘পূর্ব-পাকিস্তানের জবান’ প্রকাশিত হয়। এতে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা তথা জাতীয় ভাষা করা না হলে কি সংকট দেখা দিতে পারে তার ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু আবুল মনসুর আহমদ এবং অন্যান্য চিন্তানায়কের সতর্কবাণী উচ্চারণ ও রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদ প্রকাশ করা সত্ত্বেও একশ্রেণীর বাঙালির উর্দু প্রীতির বিন্দুমাত্রও ঘাটতি ঘটেনি।

১৩৫২ সালে রচিত ও মাসিক ‘মোহাম্মদী’তে প্রকাশিত কবি ফররুখ আহমদের একটি ব্যঙ্গ-কবিতায় এই উর্দু প্রীতিওয়ালাদের পরিচয় বিধৃত। কবিতাটির নাম ‘উর্দু বনাম বাংলা’। এই কবিতার প্রথম তিন ও শেষ তিন পঙ্ক্তি জুড়ে দিয়ে (মাঝখানে কোনো লোপ-নির্দেশক চিহ্ন ব্যবহার না করে) সনত্কুমার সাহা এক খিচুড়ি উদ্ধৃতি দেন (‘বাংলা গদ্যের স্বরূপ সন্ধানে’, প্রাকৃত, প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা, অক্টোবর ১৯৯২)।

এই উদ্ধৃতির সঙ্গে সনৎবাবু দুটি মন্তব্যও করেন। সনৎবাবুর মতে ফররুখ আহমদ কবিতাটি লিখেছিলেন ‘অবশ্য এক বিরল মুহূর্তে’। এই প্রথম মন্তব্যটি সত্য নয়। সনৎবাবুর দ্বিতীয় মন্তব্য, ‘একে আমরা প্রক্ষিপ্ত ভাবনার আকস্মিক প্রকাশ বলেই মনে করি। নইলে ফররুখ আহমদের মত অসাধারণ কবির সততা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।’ আমরা দেখবো সনৎবাবুর এই মন্তব্য প্রমাণ করে ফররুখ আহমদের লেখার সাথে হয় তিনি পরিচিত নন, নয় সে লেখার মর্ম বোঝার ক্ষমতা তাঁর নাই।

সম্প্রতি হাসান ফেরদৌস সনৎবাবুর এই মন্তব্যের চেয়েও হীন এক কাজ করেছেন (‘নাইপলের পাকিস্তান’, প্রথম আলো, ৩০ জুন ২০০০)। ফররুখ আহমদ একদিকে যারা শরাফতির নামে বাংলা ভাষার স্থলে উর্দু ভাষা গ্রহণ করতে চাইছিলেন তাদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের দুহিতা জ্ঞানে যারা ‘অস্পৃশ্যা নারীর মত বর্ণাশ্রম শৃঙ্খলে পীড়িত’ করছিলেন তাদেরও বিরুদ্ধে। এই দুই ধরনের বিরোধিতার মধ্যে কোনো বিরোধ আছে ধরে নিয়েই সনত্কুমার সাহা ‘ফররুখ আহমদের মত অসাধারণ কবির সততা নিয়ে প্রশ্ন’ তুলেছেন। আসলে এ দুয়ে কোনো বিরোধ নাই। আমি রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই এবং সেই বাংলা চাই মৃত সংস্কৃতের বেড়াজাল মুক্ত। এতে বিরোধ কোথায়?

হাসান ফেরদৌসের সততা নিয়ে বরং আমার মনে একটি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্যার বিদিয়াধর সূরযপ্রসাদ নাইপলের থিসিস—অনারব মুসলমানরা মাতৃভাষার চাইতে আরবিতে বেশি উত্সাহী, মাতৃভূমির চাইতে আরব দেশের প্রতি বেশি অনুগত—প্রমাণের খাতিরে হাসান সাহেব দাবি করেছেন চল্লিশ বছর আগের বাংলা কবিতায় ‘কবিদের ভাষা বাহ্যত বাংলা হলেও আরবি শব্দের উপস্থিতি তাতে প্রবল ও তীব্র।’ হাসান লিখেছেন: ‘আর যে স্বপ্নে ভরা কবিদের চোখ, সেখানেও আরবি দুলদুল, মরুর হাওয়া, শুষ্ক খর্জুর।’ হাসান ধরে নিয়েছেন ‘আরবি শব্দের উপস্থিতি’ ‘প্রবল ও তীব্র’ হলে কবিদের ভাষা অন্তরে আর বাংলাই থাকে না—‘বাহ্যত বাংলা’ হয় মাত্র।

ফররুখ আহমদকে সনত্কুমার সাহা ‘আরব ভূখণ্ডে শিকড় সন্ধানী’ কবি বলে ডেকেছিলেন। ফররুখের কবিতায় আরবি শব্দ ও আরব্য প্রসঙ্গ দেখে তাঁর ধারণা হয়েছিল এই কবির পক্ষে বাংলা ভাষার পক্ষাবলম্বন সম্ভব নয়। তাই তিনি ফররুখের ‘উর্দু বনাম বাংলা’ সনেটটিকে ‘বিরল’ মুহূর্তের রচনা আর ‘প্রক্ষিপ্ত ভাবনার আকস্মিক প্রকাশ’ বলে ভুল করেছিলেন। হাসান ফেরদৌসও উদ্ধৃতি সহযোগে দেখান ফররুখ আহমদ বাংলায় আরবি শব্দ বেশি ব্যবহার করেছেন। ‘উর্দু বনাম বাংলা’ কবিতার দুই লাইন ‘দুই শো পঁচিশ মুদ্রা যে অবধি হয়েছে বেতন/বাংলাকে তালাক দিয়ে উর্দুকেই করিয়াছি নিকা’ উদ্ধারপূর্বক হাসান দাবি করলেন: ‘বলাবাহুল্য উর্দুর সাথে এক নিকাহ বাসনার ফল যে পাকিস্তান সৃষ্টির পরপর বাংলা ভাষার হরফ বদলে আরবি করার অপচেষ্টা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’ আরবি হরফে বাংলা লেখার অপচেষ্টায় কতখানি শামিল হয়েছিলেন ফররুখ আহমদ? এ প্রশ্নের উত্তর হাসান দেন নাই। হাসানের আলোচনার ক্রম ও ধরন দেখে মনে হতে পারে ফররুখ আহমদের ‘উর্দু বনাম বাংলা’ কবিতাটি স্বীকারোক্তিমূলক। কবিতাটি যে বক্রোক্তিপূর্ণ সে কথা সনৎবাবু ধরতে পেরেছিলেন। সনৎবাবু ও হাসান সাহেব দুজনেই ধরে নিয়েছিলেন ফররুখ আহমদ আরবি শব্দ বেশি ব্যবহার করার কারণে উর্দুবিরোধী হতে পারেন না। ফররুখের স্পষ্ট উর্দুবিরোধিতা সনৎবাবুর চোখে হয় আকস্মিক, দৈব ঘটনা—নয় অসৎ রচনার প্রমাণ। হাসানের চোখে ওটা উর্দুবিরোধিতাই নয়। পক্ষপাত বরং।

ফররুখ আহমদ যে রাষ্ট্রভাষা বিতর্কের আদি পর্বেই বাংলার পক্ষ নিয়েছিলেন তা হিসেবে নিলে সনৎবাবু স্বীকার করতেন কাজটি মোটেও আকস্মিক ছিল না। সওগাত-সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সাক্ষ্য অনুসারে: ‘১৩৫৪ সালের ভাদ্র মাসে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সে মাসেই তিনি সওগাতের জন্য একটি প্রবন্ধ লিখলেন—“পাকিস্তান: রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য” নাম দিয়ে। এ প্রবন্ধটি পরবর্তী সংখ্যা আশ্বিনের সওগাতে ছাপা হয়। প্রবন্ধের প্রারম্ভেই তিনি লিখেছিলেন: “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, এ নিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আলোচনা হয়েছে। জনগণ ও ছাত্রসমাজ অকুণ্ঠভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। সুতরাং এটা দৃঢ়ভাবেই আশা করা যায় যে, পাকিস্তানের জনগণের বৃহৎ অংশের মতানুযায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্বাচিত হবে। যদি তাই হয়, তবে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, বাংলা ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে।”—ভাষা সম্পর্কে আন্দোলন আরম্ভ হবার পূর্বেই ফররুখ আহমদ এ মতামত ব্যক্ত করেছিলেন।’

ফররুখ আহমদের এই প্রবন্ধ এখন তাঁর রচনাবলীর প্রথম খণ্ডে ছাপা হয়েছে (মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ও আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত ‘ফররুখ রচনাবলী: প্রথম খণ্ড’ ঢাকা: আহমদ পাবলিশিং হাউস, ১৯৭৯)। প্রবন্ধটির শেষ ভাগে তিনি লেখেন: ‘গণতান্ত্রিক বিচারে যেখানে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিত সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাকে যাঁরা অন্য একটি প্রাদেশিক ভাষায় রূপান্তরিত করতে চান তাঁদের উদ্দেশ্য অসৎ। পূর্ব পাকিস্তানের সকল অধিবাসীর সাথে আমিও এই প্রকার অসাধু প্রতারকদের বিরুদ্ধে আমার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’ বাংলা ভাষার বিরোধিতাকারীরা তাঁর চোখে ‘প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণী’।

ফররুখ আহমদ লিখেছেন: ‘পাকিস্তানের, অন্তত পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা হবে এ কথা সর্ববাদীসম্মত হলেও আমাদের এই পূর্ব পাকিস্তানেরই কয়েকজন তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তি বাংলা ভাষার বিপক্ষে এমন অর্বাচীন মত প্রকাশ করেছেন যা নিতান্তই লজ্জাজনক। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় রূপায়িত করলে ইসলামী ঐতিহ্যের সর্বনাশ হবে এই তাঁদের অভিমত।’ এই অভিমতকে ফররুখ বলেছিলেন ‘কুৎসিত পরাজয়ী মনোবৃত্তি’।

একজন মানুষ একই সঙ্গে বাংলা ভাষার অনুরাগী এবং ইসলাম প্রচারে উত্সাহী হতে পারেন—এই তথ্যটি সনৎ সাহা, স্যার বিদিয়া বা হাসান ফেরদৌস কারও কাছেই সম্ভবপর ঘটনা নয়। অথচ ফররুখ আহমদ ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। শুধু তাই নয়, ফররুখ আহমদ গণতন্ত্রবাদীও ছিলেন। ফররুখ স্পষ্ট বুঝেছিলেন, বাংলাদেশের ভাষা উর্দু এই দাবির প্রধান প্রেরণাটা অভিজাত বা শরাফতি মানসিকতাজাত। ইসলাম প্রচার এর প্রধান কারণ নয়। ফররুখ বাংলার পক্ষ নিয়েছিলেন ইসলাম প্রচারের পথ আরো সুগম করার খাতিরে।

ফররুখ আহমদ লিখেছেন: ‘যে মনোবৃত্তির ফলে প্রায় দুশো বছর বাংলা ভাষায় ইসলামের প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ ছিল, সেই অন্ধ মনোবৃত্তি নিয়েই আবার আমরা ইসলামকে গলাটিপে মারার জন্য তত্পর হয়ে উঠেছি। দুঃখের বিষয় সন্দেহ নাই। কিন্তু আরো দুঃখের কথা এই যে, পূর্ব পাকিস্তানে এমন মানুষ আছেন (সংখ্যায় যত অল্পই হোক না কেন) যাঁরা একমাত্র মানসিক দুর্বলতার জন্যই মাতৃভাষাকে মাতৃভাষার মাধ্যমে অস্বীকার করে ইসলামী ঐতিহ্যের মহান দায়িত্ব অপর একটি প্রাদেশিক ভাষার কিঞ্চিৎ-পরিপুষ্ট ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন। কারণ: (এক) ঐ প্রাদেশিক ভাষাটি তথাকথিত শরিফদের ভাষা।’

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শোরুম ইনচার্জ পদে জনবল নিয়োগ দেবে র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স

1

হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন-আমিরাতি তেল পরিবহনে হামলার হুঁশিয়ার

2

সারজিস আলমের নামে ব্যঙ্গাত্মক ফটোকার্ড সত্য বলে প্রচার বিজেপ

3

নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড লাইভ সম্প্রচারের পরিকল্পনা রক্ষা কর

4

দেশ ও দেশের বাইরে গুপ্ত গোষ্ঠী ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে: রিজভী

5

উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব: সংকট ও সম্ভাবনার খোঁজে

6

সরকারের পাওনা ১২৬ কোটি টাকা, ফাঁকি দিতে অভাবনীয় জালিয়াতি ওসম

7

হুতির ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যর্থ সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্

8

সেলমা ব্লেয়ারের বিরুদ্ধে হামলার নতুন অভিযোগ, জামিন মঞ্জুর

9

জন্তর মন্তরে বিক্ষোভ, সিজেপি নেতাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ

10

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের নির্দেশ

11

পুতিন-কিমের সঙ্গে চুক্তি চান ট্রাম্প

12

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে খারাপ জিনিসকে 'না' বলতে শিখতে হবে: প্রতি

13

সরকারি ভবনের ছাদে ৩৭০ কোটি টাকার সৌর প্যানেল, রক্ষণাবেক্ষণ ন

14

ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে জানলেন তিনি ‘মৃত’

15

এপেক সম্মেলনে এআই অর্থনীতি নিয়ে আলোচনার সুযোগ

16

ভোটার তালিকা সংশোধন চ্যালেঞ্জ: রাহুল গান্ধির আবেদনে নির্বাচন

17

নরসিংদীতে বাবার বিরুদ্ধে ছেলেকে হত্যার অভিযোগ

18

নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি আবাসন খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ: র্

19

সেমিকন্ডাক্টর খাতের বিকাশে টাস্কফোর্স গঠন, সদস্য ১৩ জন

20