সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে ইউরোপের ছোট্ট দেশ স্লোভেনিয়ার ডোমেইন নিবন্ধন দপ্তরে হঠাৎ করেই অভূতপূর্ব কর্মব্যস্ততা শুরু হয়। দেশটির সরকারি ডোমেইন রেজিস্ট্রেশনের সার্ভার ‘রেজিস্টারডটএসআই’–তে যেন আছড়ে পড়ে এক অদৃশ্য সুনামি। দপ্তরের মুখপাত্র ক্লারা হারমান আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে এ বিস্ময়কর তথ্য জানান।
ওই এক মাসেই স্লোভেনিয়ার কান্ট্রি কোড ডটএসআই–যুক্ত ওয়েবসাইটের ঠিকানা নিবন্ধিত হয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার। অথচ ঠিক তার আগের মাস আগস্টে এই নিবন্ধনের সংখ্যা ছিল দুই হাজারের কম। গাণিতিক হিসাবে এই বৃদ্ধির হার ২ হাজার ১০০ শতাংশের বেশি। সবচেয়ে বড় চমক আসে ৩০ সেপ্টেম্বর, ওই এক দিনেই বিশ্বজুড়ে মানুষ ১১ হাজার ডটএসআই–যুক্ত ডোমেইন কিনে নেন।
এই মাতামাতির কারণ লুকিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ঘোষণায়। স্লোভেনিয়ার কান্ট্রি কোড হলো এসআই। অন্যদিকে ট্রাম্প বহুল প্রচলিত প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)-এর নাম বদলে এর নতুন নাম দিয়েছেন সুপার ইন্টেলিজেন্স (এসআই)।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে প্রযুক্তিজগতের শীর্ষ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে একটি বিশেষ বৈঠক ডাকেন। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজে এই বৈঠককে ‘অসাধারণ সমাবেশ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। শুধু তা-ই নয়, এই বৈঠকে উপস্থিত অতিথিদের তিনি বর্ণনা করেছেন ‘আমেরিকার স্বর্ণযুগ গড়ে তোলা’ মানুষ হিসেবে। সেই আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় ছিলেন ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, এনভিডিয়া, স্পেসএক্স, মেটা এবং গুগলের মতো টেক-জায়ান্টদের শীর্ষ নির্বাহীরা।
রুদ্ধদ্বার এই বৈঠকের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় ৩০ মিনিট সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন। বিবিসি তাদের বিস্তারিত প্রতিবেদনে লিখেছে, ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমকে জানান, শীর্ষ নির্বাহীরা ‘নৈতিকভাবে বাধ্যতামূলক’ একটি দলিলে সই করেছেন। এই দলিল মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাব্য ও ভবিষ্যৎ–ঝুঁকির বিরুদ্ধে একধরনের ‘সুরক্ষা’ হিসেবে কাজ করবে বলে দাবি করা হয়েছে।
মজার বিষয় হলো, ওই দলিল ট্রাম্প নিজেই অনলাইনে প্রকাশ করে দিয়েছেন। সেই চুক্তিতে ট্রাম্পের সঙ্গে স্বাক্ষর করেছেন গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই, অ্যানথ্রপিকের দারিও আমোদেই, মেটার মার্ক জাকারবার্গ, ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান, স্পেসএক্সের ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং। ট্রাম্প অত্যন্ত গর্বভরে এই চুক্তিকে ‘একদিক থেকে সংবিধানের মতো’ বলে মন্তব্য করেছেন।
স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, এত ঢাকঢোল পিটিয়ে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত করা হলো, সেই চুক্তিতে আসলে কী আছে? বিবিসির বিবরণ অনুযায়ী, এই চুক্তির মূল কথা হলো—কোম্পানিগুলো নিজ নিজ উদ্ভাবিত প্রযুক্তির নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরাই গ্রহণ করছে। তাদের তৈরি করা মডেল যেন ঠিক প্রত্যাশামতোই কাজ করে এবং বিপথে না যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচ বসানো এবং কোনো ত্রুটি বা সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত শনাক্ত করে সারিয়ে তোলার অঙ্গীকার রয়েছে ওই দলিলে।
কোম্পানিগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা ‘স্বাধীন নিরীক্ষকদের’ সঙ্গে মিলে কাজ করবে এবং যাচাই করে দেখবে, এআই–ব্যবস্থা যেন তার নির্ধারিত কাজের গণ্ডির বাইরে গিয়ে অন্য কোনো সংবেদনশীল প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় অনধিকার প্রবেশ না করে বা ঢুকে না পড়ে। প্রখ্যাত আইনি পরামর্শক সংস্থা ফ্রেশফিল্ডস এই চুক্তির একটি সারাংশ তৈরি করেছে, যেখানে এই অঙ্গীকারগুলোর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণের প্রক্রিয়া এবং বোর্ড-স্তরের তদারকির কথাও যোগ করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চুক্তি সম্পূর্ণ একটি স্বেচ্ছামূলক চুক্তি। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো আইন বা নির্দেশিকা নয়; বরং এটি প্রযুক্তি–শিল্পের নিজেদেরই স্বাক্ষরিত এক অঙ্গীকারনামামাত্র।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের আরও বলেন, তিনি এআই সরঞ্জামের সার্বিক নিরাপত্তা দেখভালের জন্য একটি নতুন বোর্ড গঠন করবেন। তবে সেই বোর্ডের সদস্য কারা হবেন, তা নিয়ে তিনি এখনো কিছুই খোলাসা করেননি।
মেটার প্রধান মার্ক জাকারবার্গ হোয়াইট হাউসের বৈঠকটিকে ‘ঐতিহাসিক আলাপ’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, এই চুক্তি মার্কিন নাগরিক ও সাধারণ গ্রাহকদের মনে এই আস্থা তৈরি করবে, প্রযুক্তিটি যেমন কথা দিচ্ছে, ঠিক তেমনই কাজ করছে।
অন্যদিকে অ্যানথ্রপিকের প্রধান দারিও আমোদেই এই চুক্তিকে ‘নিরাপদে জেতার’ একটি উপায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, আমোদেইয়ের কথাটি মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের এক মন্তব্যেরই প্রতিধ্বনি, যেখানে ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন, বিশ্বজুড়ে এআইয়ের দৌড়ে যে জিতবে, সে-ই ভবিষ্যতের পৃথিবীতে জিতবে।
স্লোভেনিয়ার ডোমেইন বাজারের এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রধানের একটি সাধারণ শব্দের ঘোষণাও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কত দূর পর্যন্ত ঢেউ তুলতে পারে।
হোয়াইট হাউসে স্বাক্ষরিত এই ‘অ্যাকর্ড’ বা চুক্তি নিয়ে প্রযুক্তি কোম্পানির প্রধানেরা ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যতই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করুন না কেন, সবাই কিন্তু এতে আশ্বস্ত হতে পারেননি। বিবিসির প্রতিবেদনে তিনজন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদের মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছে এবং অবাক করার বিষয় হলো—তাঁরা তিনজনই এই চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে অত্যন্ত সংশয়ী।
সিঙ্গাপুরের প্রখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ন্যানইয়াং টেকনোলজিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই পরিচালনা ও নীতিবিষয়ক গবেষক হোসে মিগুয়েলিতো এনরিকেজ তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, এই চুক্তিতে একটি ‘উদীয়মান ঐকমত্য’ দেখা যায় ঠিকই, যা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর এক টেবিলে বসার প্রমাণ দেয়। কিন্তু সমস্যা হলো, যদি ভবিষ্যতে কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে বা এআই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন এই এআই নির্মাতারা কীভাবে আইনিভাবে জবাবদিহি করবে বা আদৌ করবে কি না, তা এ চুক্তির কোথাও বলা নেই।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক কিমবারলি ওয়েদারল্যাল এই চুক্তির সমালোচনায় আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি সরাসরি এ চুক্তিকে ‘গভীরভাবে অপ্রভাবশালী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই চুক্তির ভাষা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে মনে হয়, কোম্পানিগুলো নিজেরাই নিজেদের সুবিধামতো ঠিক করে নিতে পারবে, ‘নিরাপত্তা বলতে কী বোঝায়’।
ওয়েদারল্যাল বলেন, যদি কোনো কোম্পানি এই চুক্তি ভাঙে, তবে তার পরিণতি কী হবে বা তাদের কোনো শাস্তি দেওয়া হবে কি না, সে কথারও কোনো উল্লেখ নেই এখানে। তাঁর চূড়ান্ত মূল্যায়ন হলো, এই চুক্তি আসলে উপেক্ষা করাই ভালো। কারণ, এটি মূল সমস্যা থেকে অন্যদিকে নজর ঘোরানোর একটি ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়।
অন্যদিকে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জিনি প্যাটারসন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতি আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেন, আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়া এ ধরনের স্ব-নিয়ন্ত্রণের ফলে কোম্পানিগুলো নিজেদের ব্যবসায়িক সুবিধার্থে শুধু ‘ন্যূনতম রক্ষাকবচ’ রাখতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে এআইয়ের বিভিন্ন মডেলে গোলযোগ দেখা দেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এআই ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ চলে যাওয়ার যেসব নজির ইতিমধ্যে দেখা গেছে, তাতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শৃঙ্খলাবোধ ও নৈতিকতার ঘাটতিই ফুটে ওঠে বলে তিনি জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেন।
বিশেষজ্ঞদের এই সংশয়ের পেছনে কিন্তু নিছক তত্ত্বগত ভয় নয়; বরং কিছু জ্বলন্ত বাস্তব ঘটনাও রয়েছে। বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসের ওই হাই-প্রোফাইল বৈঠকের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ সোমবারই ওপেনএআই নিরাপত্তাজনিত গভীর উদ্বেগের কারণে তাদের সর্বশেষ প্রধান মডেল জিপিটি-৬.১ অ্যাস্ট্রার প্রকাশ চূড়ান্ত মুহূর্তে বাতিল করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা-ব্যবস্থা ও স্বচ্ছতা এর আগেও বিশ্বজুড়ে কড়া নজরদারি ও সমালোচনার মুখে পড়েছিল। বিশেষ করে অস্ট্রেলীয় সরকারের একটি সুরক্ষিত প্ল্যাটফর্মে ওপেনএআইয়ের মডেলের বিনা অনুমতিতে অনধিকার প্রবেশের মতো গুরুতর ঘটনা ঘটেছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এসব ঘটনাই প্রমাণ করে, শুধু মুখের কথায় বা একটি স্বেচ্ছাচুক্তিতে স্বাক্ষর করলেই এআইয়ের মতো জটিল প্রযুক্তির ঝুঁকি রাতারাতি উধাও হয়ে যায় না।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই নতুন এআই নীতিকে বুঝতে হলে একটু পেছনের দিকে তাকাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় ধরনের এক দিকবদল স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আবার ক্ষমতায় আসার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেনের এআই-সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশটি বাতিল করে দেন।
ইয়াহু নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাইডেনের সেই আদেশে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট রিপোর্টিংয়ের ব্যবস্থা ছিল এবং যেকোনো নতুন মডেলের নিরাপত্তা-পরীক্ষার যাবতীয় তথ্য ফেডারেল কর্তৃপক্ষকে বাধ্যতামূলকভাবে দিতে হতো। সেটি ছিল আইনের কঠোর প্রয়োগ।
কিন্তু ট্রাম্পের আমলে করা এবারের এই নতুন অ্যাকর্ড বা চুক্তিটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক। এখানে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে পর্যবেক্ষকদের মনে খুব স্বাভাবিক ও যৌক্তিক একটি প্রশ্ন ওঠে: এখানে আসল খবর কোনটি? মার্কিন প্রশাসনের কি এআই কোম্পানিগুলোর বাধ্যতামূলক জবাবদিহি থেকে সরে এসে কেবল স্বেচ্ছা-অঙ্গীকারের ওপর ভরসা করাটা আসল খবর, নাকি স্রেফ প্রযুক্তিটির নতুন একটি নাম দেওয়াটাই মূল এজেন্ডা?