ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেব্রন শহরে ইসরায়েলি বাহিনীর অবরোধ টানা দশম দিনে গড়িয়েছে। এই অবরোধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার ফলে আরও বেশি ফিলিস্তিনি পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
গত ২৩ অক্টোবর হেব্রনের কাছে দুজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর এই অবরোধ আরোপ করা হয়। স্থানীয় পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৩,৩০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, অনেকের বাড়িঘর ধ্বংস করা হয়েছে এবং ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
শনিবার আল জাজিরাকে হেব্রনের মেয়র ইউসুফ আল-জাবারী বলেন, প্রতিদিনের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১২ মিলিয়ন শেকেল (৩.৮ মিলিয়ন ডলার) ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে ১.৯ মিলিয়ন ডলারের বেশি, আর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৬০,০০০ ডলার।
মেয়র জানান, ইসরায়েলি বাহিনী ১৫টি বাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং ৩২৭টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য করেছে। প্রায় ৮০,০০০ শিক্ষার্থী দশ দিন ধরে স্কুলে যেতে পারেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আল-জাবারী বলেন, হেব্রন ফিলিস্তিনি অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং এই অবরোধকে তিনি ‘সম্মিলিত শাস্তি’ বলে অভিহিত করেন। শহর ও আশপাশের ফিলিস্তিনি পরিবারগুলি আশঙ্কা করছে যে সেনাবাহিনী শীঘ্রই তাদের আক্রমণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
রবিবারও অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেব্রন ও অন্যান্য শহরে ফিলিস্তিনিদের গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত ছিল। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফার খবর অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনী হেব্রনের দক্ষিণে মাসাফের ইয়াত্তায় ১০ জন ফিলিস্তিনি শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে এবং তাদের গাড়ি জব্দ করেছে।
ফিলিস্তিনি মিডিয়ার শেয়ার করা এবং আল জাজিরার যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা যায়, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের শুয়াফাত শরণার্থী শিবিরে জাতিসংঘ পরিচালিত একটি স্কুলে হানা দিয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা ওসিএইচএ জানিয়েছে, অক্টোবরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ৩৯৭টি হামলা চালিয়েছে, যা ২০০৬ সালে পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে এক মাসে সর্বোচ্চ সংখ্যা। ২০ থেকে ২৬ অক্টোবরের মধ্যে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ৪৯টি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বেশিরভাগই জলপাই সংগ্রহের সময়।
একই সময়ে বসতি স্থাপনকারী ও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ৫৭ জন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নয়জন শিশু। এদের মধ্যে ৩৪ জন ইসরায়েলি বাহিনীর গুলি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার এবং ২৩ জন বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় আহত হয়েছেন।
২০১৫ সাল থেকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি সম্পত্তির বিরুদ্ধে ৯,৫১৮টি ভাঙন বা কাজ বন্ধের নোটিশ জারি করেছে বলে জানিয়েছে উপনিবেশ ও দেয়াল প্রতিরোধ কমিশন। তাদের মতে, এ বছরের প্রথম নয় মাসে ৩৪৪টি নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
ফিলিস্তিন ইকোনমিক পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উন্নয়ন ও শ্রম অর্থনীতিবিদ ইউসুফ দাস আল জাজিরাকে বলেন, অবরোধ শুরুর পর থেকে হেব্রনের ব্যবসায়ীরা ধ্বংস হওয়া মালামাল, স্থাপনা, দোকান ও কারখানার ক্ষতির পরিমাণ ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কিছু ব্যবসায়ীকে তাদের গুদাম খালি করার সুযোগও দেওয়া হয়নি।’
দাস উল্লেখ করেন, ‘এগুলি দশক ধরে গড়ে ওঠা ছোট ও মাঝারি পারিবারিক ব্যবসা, সাধারণত কোনও বীমা থাকে না। তাদের ব্যাংক ঋণও থাকে। ফলে মালিক ব্যবসা হারান, কিন্তু ঋণ থেকে যায়।’