উপকূলের নোনা জমিতে একসময় জলকষ্ট আর হাহাকার ছিল নিত্যদিনের দীর্ঘশ্বাস। সাতক্ষীরার শ্যামনগর কিংবা খুলনার কয়রায় ১০ মাত্রার নোনা জমির ধূসর বুকে এখন বাতাসে সুর তোলে সবুজ ধানের সোনালী শীষ। দীর্ঘদিন পতিত থাকা জমিতে লবণসহিষ্ণু জাতের সফল আবাদ করে ওই অঞ্চলের প্রদীপ কুমার কিংবা বিপ্লব মন্ডলের মতো কৃষকরা এক নীরব অলৌকিক উপাখ্যান লিখেছেন।
উন্নত বীজ, আধুনিক চাষপদ্ধতি আর নিখুঁত প্রযুক্তির ছোঁয়ায় রূপান্তরের এমন গল্প শুধুই অনাবাদি নোনা মাটিকে সোনালী ফসলে ভরিয়ে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দেশের মাটি ও কৃষির সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান ও গভীর অর্থনৈতিক বন্ধনকে সামনে এনেছে। আর এই বন্ধন ছড়িয়ে গেছে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে সারাদেশে।
মাঠে ধানের হাইব্রিড বীজ থেকে শুরু করে রান্নাঘরের হরেক পদের হাইব্রিড সবজি; মাটির বুক চেরা পাওয়ার টিলার থেকে কম্বাইন্ড হারভেস্টার কিংবা শাহজালাল সার কারখানা থেকে অত্যাধুনিক কৃষি গবেষণা— বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার প্রতিটি স্পন্দনে গত কয়েক দশকে জোরালো হয়েছে চীনা প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও গভীর সহযোগিতার উপস্থিতি।
গল্পটি কেবল আমদানির বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়; চীনা জার্মপ্লাজম ও প্রযুক্তিকে বাংলাদেশের মাটি ও বাতাসের উপযোগী করে গবেষণাগারে জন্ম নিচ্ছে আমাদের নিজস্ব জাত। আবার চীনা যন্ত্রের হাত ধরে গড়ে উঠছে দেশীয় খুচরা যন্ত্রাংশের এক সম্ভাবনাময় শিল্পক্ষেত্র। প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় উৎপাদন এবং নিজস্ব কৃষি শিল্পের এই যুগলবন্দী একসময়ের মুখাপেক্ষী সম্পর্ককে নিয়ে গেছে রূপান্তরের নতুন অধ্যায়ে।
যেমন— দেশে হাইব্রিড বীজের বিপ্লব ঘটলেও তার মূল ‘প্যারেন্টাল লাইন’ বা মাতৃজাতটি এখনও আসে সীমানা পেরিয়ে বিদেশ থেকে। আবার আমাদের দেশীয় ওয়ার্কশপে ছোট ছোট যন্ত্রাংশ তৈরিতে আমরা স্বাবলম্বী হলেও উচ্চপ্রযুক্তির দানবীয় মেশিনের জন্য চোখ মেলে রাখতে হয় সেই আমদানির পথেই। সবমিলিয়ে পাঁচ দশকের বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের কৃষি অধ্যায় এক রোমাঞ্চকর মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ যেমন চীনের প্রযুক্তির ঝুড়ি থেকে নিচ্ছে প্রাণদায়ী বীজ, যন্ত্র, সার ও গবেষণার রসদ; ঠিক তেমনি চীনের বিশাল বাজারও বাংলাদেশের সোনালী আঁশ পাটসহ হরেক কৃষিপণ্যের জন্য মেলে ধরেছে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দুয়ার। শ্যামনগরের সেই প্রত্যন্ত নোনা ধানখেত থেকে শুরু করে গবেষণাগারের টেস্টটিউব, বগুড়ার কৃষিযন্ত্রের কারখানা কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিশাল সমীকরণ— সবখানেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দুই দেশের কৃষি অর্থনীতির এক গভীর, সম্ভাবনাময় ও নতুন বন্ধন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ-চীন কৃষি সম্পর্ক আজ প্রযুক্তি গ্রহণ ও বাণিজ্যিক সুবিধার গণ্ডি পেরিয়ে দুই দেশের কৃষি অর্থনীতিকে গভীর অর্থনৈতিক বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে চীনা যন্ত্র ও প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে গড়ে উঠছে স্থানীয় যন্ত্রাংশ শিল্প ও নতুন জাতের ধান-সবজি।
বাংলাদেশের কৃষি খাতের আধুনিকায়নে চীনা প্রযুক্তি ও উপকরণ এখন অত্যন্ত প্রভাবশালী। বার্ষিক ৬০০ থেকে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের কৃষি সরঞ্জাম ও বীজ চীন থেকে আমদানি হয়। দেশের হাইব্রিড ধানের প্রায় ৬০ শতাংশ জাতের মূল উৎস চীন। এছাড়া, কৃষি যন্ত্রপাতি ও প্রসেসিং প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে দেশের মূল কৃষি জিডিপির প্রায় ১.৫ থেকে ২ শতাংশ সরাসরি চীনা প্রযুক্তিনির্ভর।
একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম স্বনির্ভরতার ওপর জোর দিয়ে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা চীন থেকে বীজ আনি। তবে, বর্তমানে চীনের কোম্পানিগুলোর যৌথ উদ্যোগে দেশেই বীজ উৎপাদন হচ্ছে, ফলে ধীরে ধীরে আমদানি কমে আসছে। কিছু কৃষিপণ্য, ফলমূল, সার ও যন্ত্রপাতি আমদানি হলেও বিশেষ করে কৃষি যন্ত্রপাতিতেই আমরা চীনের ওপর বেশি নির্ভরশীল, কারণ অন্যান্য দেশের তুলনায় চীনা যন্ত্র সস্তা। তবে, শুধু আমদানির ওপর নির্ভর না করে যৌথভাবে বাংলাদেশে কারখানা প্রতিষ্ঠা করে উৎপাদন করা প্রয়োজন। কৃষি খাতে স্বাবলম্বী হতে যৌথ বিনিয়োগ ও ক্যাপিটালের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতকেই এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে কৌশলগত সুসম্পর্ক এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু কৃষি খাত নয়, কৃষি-বহির্ভূত শিল্পেও চীনের বড় অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রেও আমাদের উচিত চীনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নেওয়া ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর করা, বিশেষ করে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিল্প খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা।’
সাবেক কৃষি সচিব, বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা ও কৃষি বিশেষজ্ঞ আনোয়ার ফারুক চীনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে জোর দিয়ে ঢাকা পোস্টকে বলেন, “বীজের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চীনের পাশাপাশি ভারত ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। বিশ্বায়নের যুগে কেউ একা চলতে পারে না, তাই আমাদেরও বিকল্প পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে। আধুনিক কৃষিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও যান্ত্রিকীকরণ খুবই জরুরি, কারণ আমাদের ‘পোস্ট-হারভেস্ট লস’ অনেক বেশি। আমাদের স্থানীয় কৃষি শিল্পগুলো এখন ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে, তবে এ ক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা বাড়ানো দরকার। প্রযুক্তি ও উৎপাদন খরচের দিক বিচারে চীনা কৃষি যন্ত্রাংশ বেশ সাশ্রয়ী, তাই স্থানীয়ভাবে যৌথ উদ্যোগ গড়ে তোলা সুবিধাজনক হবে।”
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘চীনের কৃষি প্রযুক্তিগুলো অত্যন্ত কৃষকবান্ধব এবং অর্থনীতির জন্য লাভজনক। আমি একাধিকবার চীন সফর করে মাঠপর্যায়ে এসব প্রযুক্তির প্রয়োগ দেখেছি, যা আমাদের দেশের কৃষি ব্যবস্থার জন্য খুবই উপযোগী। এগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে আমাদের কৃষি খাত আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।’
উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয়নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘শুধুমাত্র ফলন বাড়ানোই শেষ কথা নয়; কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, অপচয় রোখা, শ্রমের সাশ্রয় এবং উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ করে তোলাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। যে প্রযুক্তি কৃষক সহজে ব্যবহার করতে পারবেন এবং যা তার খরচ কমাবে, সেটিই আমাদের বেশি প্রয়োজন।’
বিদেশি প্রযুক্তির স্থানীয়করণের বিষয়ে এই কৃষিবিজ্ঞানী যোগ করেন, ‘চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমরা প্রযুক্তি আনব ঠিকই, কিন্তু সেটিকে হুবহু প্রয়োগ না করে আমাদের দেশের আবহাওয়া, মাটি, জমির ধরন এবং স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে মানানসই করে নিতে হবে। এ জন্য পর্যাপ্ত গবেষণাভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তবেই বিদেশি প্রযুক্তি আমাদের দেশের কৃষির জন্য টেকসই ও কার্যকর সুফল বয়ে আনবে।’
বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগান, শিল্প খাতের কাঁচামাল সরবরাহ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখছে কৃষি। গত এক দশকে (২০১৫–১৬ থেকে ২০২৫–২৬ অর্থবছর) পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপিতে) কৃষি, বন ও মৎস্য খাতের অবদান প্রায় ১১ শতাংশ। যদিও এক দশকে টাকার অঙ্কে কৃষি জিডিপির স্থির মূল্য প্রায় ২ হাজার ৭৯৫ বিলিয়ন থেকে বেড়ে প্রায় চার হাজার বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। যেখানে দেশের ৪০-৪৫ শতাংশ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান জড়িত।
কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির আধুনিকায়নে চীন শুরু থেকেই অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। প্রথাগত কায়িক শ্রমের জায়গা নিয়েছে পাওয়ার টিলার, মিনি ট্রাক্টর, সেচ পাম্প, থ্রেসার ও কম্বাইন্ড হারভেস্টার, যার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ যন্ত্রপাতির মূল উৎস চীনা প্রস্তুতকারক।
জাতিসংঘের কমট্রেড এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশে কৃষি যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে বার্ষিক যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তার সিংহভাগই যায় চীনে। প্রতি বছর গড়ে ৩৫০ থেকে ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চীনা কৃষি প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি আমদানি করা হচ্ছে। কেবল যান্ত্রিকীকরণেই নয়, উচ্চফলনশীল ফসল উৎপাদন ও আধুনিক সুরক্ষায় চীনা বীজ ও রাসায়নিক কাঁচামালের ভূমিকাও অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।
বাংলাদেশে মোট ধান উৎপাদনের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে হাইব্রিড জাত। হাইব্রিড ধান বীজের প্রায় ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশই চীন থেকে সরাসরি আমদানি হয় কিংবা চীনা প্রযুক্তির সহায়তায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এবং বেসরকারি খাতের তথ্য অনুযায়ী, হাইব্রিড ধান ও সবজি বীজ এবং কীটনাশক তৈরির কাঁচামাল বাবদ চীন থেকে বছরে প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের সামগ্রী আমদানি করা হয়।
উৎপাদনপরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণ, হিমাগার তৈরি ও চালকলগুলোর আধুনিকায়নেও চীনা প্রযুক্তির দাপট স্পষ্ট। দেশের আধুনিক অটো রাইস মিলের সিংহভাগ যন্ত্রপাতি চীনা প্রযুক্তিতে চালিত। এছাড়া, ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার মতো মেগা অবকাঠামো নির্মাণে চীনা আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেশের সার সংকট মেটাতে এবং কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বড় ধরনের পরোক্ষ ভূমিকা রাখছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়ছে লোনা পানি। এই বিরূপ পরিস্থিতিতে চীনা হাইব্রিড জাত ও চীনা জার্মপ্লাজম ব্যবহার করে উদ্ভাবিত ‘ব্রি ধান ৯৯’-এর মতো লবণসহিষ্ণু ধান নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। প্রতিকূল পরিবেশেও প্রতি হেক্টরে ৭ টনের বেশি ফলন নিশ্চিত করে নোনা জমিতে সোনালী ফসলের নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকরা।
সামগ্রিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর চীন থেকে প্রায় ৬০০ থেকে ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কৃষি উপকরণ ও প্রযুক্তি বাংলাদেশে আসে। এর বিপরীতে চীনে বাংলাদেশ থেকে কৃষিপণ্য রপ্তানির পরিমাণ খুবই নগণ্য।