নয়াদিল্লি: ২০১১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতের প্রায় ৫০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়ে দেশটিতে চরম দারিদ্র্যের হার ২৭.১ শতাংশ থেকে কমে ২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এই দেশে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের দারিদ্র্য থেকে উত্তরণকে 'উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি' বলে অভিহিত করেছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দৈনিক ৩ ডলারের ভিত্তিতে চরম দারিদ্র্যের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এই হারে খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও বস্ত্রের মতো মৌলিক প্রয়োজনীয়তা মেটানোর ন্যূনতম আয়কে বোঝায়। এছাড়া দৈনিক ৪.২ ডলারের নিম্ন-মধ্যম আয়ের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যার অনুপাত ৫৭.৭ শতাংশ থেকে কমে ১৬.১ শতাংশ হয়েছে। এই হারে প্রায় ৪৯ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক দারিদ্র্য অর্থনীতিবিদ আয়াগো ওয়াম্বিলের নেতৃত্বে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, 'ভারতে দারিদ্র্য আরও কমবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে, যদিও তা ধীরগতিতে হবে। ২০২৮ সালের মধ্যে ৪.২ ডলারের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীর হার ২০২৬ সালের ১৪.২ শতাংশ থেকে কমে ১২.১ শতাংশ হবে।' প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, 'এই অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল শক্তিশালী ভোগ বৃদ্ধি, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং খাদ্য ভর্তুকিসহ সামাজিক হস্তান্তর কার্যক্রমের সম্প্রসারণ।'
দারিদ্র্যের হার নির্ধারণে ভারতের জাতীয় নমুনা জরিপ সংস্থা (এনএসএসও) পরিচালিত পরিবারভিত্তিক ভোগ ব্যয় জরিপ (এইচসিইএস) ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, এই অগ্রগতি বিশ্বের দ্রুততম দারিদ্র্য হ্রাসের একটি। এদিকে, গত মাসে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭.১ শতাংশে উন্নীত করেছে বিশ্বব্যাংক।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইনস্টাগ্রামে দারিদ্র্য বিমোচনে দেশের অগ্রগতির প্রশংসা করে লিখেছেন, 'দারিদ্র্যে ঐতিহাসিক পতন, সুযোগে প্রজন্মগত উত্থান।' গত নভেম্বরে দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালা চরম দারিদ্র্যমুক্ত ঘোষণা করা প্রথম রাজ্য হয়ে ইতিহাস তৈরি করেছে। কেরালার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার পরিসংখ্যান দেশের অন্যান্য বড় রাজ্যগুলোর তুলনায় সবচেয়ে ভালো।
তবে দারিদ্র্য কমলেও, ভারতের অর্থনৈতিক বৈষম্য উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে আয় ও সম্পদের বৈষম্য বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে অর্থনীতি উন্মুক্ত করার পর থেকে এই ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের সাফল্যের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ধারাবাহিক সরকারগুলোর সামাজিক কল্যাণ প্রকল্প। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং চালু করেছিলেন ১০০ দিনের গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ প্রকল্প। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদি সরাসরি নগদ হস্তান্তর, বিনামূল্যে খাদ্যশস্য ও আবাসনসহ একাধিক প্রকল্প চালু করেছেন। বর্তমানে প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে বিনামূল্যে খাদ্যশস্য দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া গ্রামীণ এলাকায় শৌচাগার নির্মাণ এবং পাইপযুক্ত পানির সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালের আগস্টে গ্রামীণ বাড়িতে পাইপযুক্ত পানির সুবিধা ছিল ১৭ শতাংশেরও কম, যা এখন প্রায় ৮২ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদ ভ্যালা ও করণ ভাসিন ২০২৪ সালে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জন্য লেখা এক গবেষণাপত্রে বলেছেন, নিরাপদ পানি পাওয়ার কারণে অসুস্থতা কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোর আয় বাড়াতে সাহায্য করেছে।
তবে অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন সরকার নিজে দারিদ্র্যের হার নির্ধারণ করছে না। তিনি বলেন, 'আমরা একটি অদ্ভুত দেশ, যারা একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্ধারিত দারিদ্র্যসীমাকে নিজের বলে মেনে নিয়েছি।' তাঁর মতে, ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্ধারিত মান যথেষ্ট নয়। মেহরোত্রা আরও বলেন, 'দেশে দারিদ্র্যের পরম সংখ্যা এখনও বিশ্বের সর্বোচ্চ। তাই দারিদ্র্যের হার এবং পরম সংখ্যা উভয়ই কমাতে পারলে তা বিশ্বব্যাপী বড় প্রভাব ফেলবে।'
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক সুরজিৎ ভ্যালা বিশ্বব্যাংকের তথ্যকে 'স্বর্ণমান' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে প্রতিটি দেশের জন্য দারিদ্র্য বিশ্লেষণ করে থাকে। তবে ভ্যালা ও ভাসিন তাঁদের গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন, ৮০ কোটি মানুষকে দেওয়া বিনামূল্যের খাদ্যশস্য শুধুমাত্র তাদের ক্যালরি চাহিদা মেটায়। তাঁরা লিখেছেন, 'আসল দরিদ্রদের জন্য আরও সুষম ও লক্ষ্যভিত্তিক খাদ্য ভর্তুকি পুষ্টির ফলাফল উন্নত করবে এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা মোকাবিলায় এটি আরও ভালো পদ্ধতি হবে।'