Deleted
প্রকাশ : Nov 1, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

মির্জা নাথানের বর্ণনায় বাংলার বারভূঁইয়াদের হাতি বাহিনীর গৌরবগাথা

মহাভারত থেকে আইন-ই-আকবরী পর্যন্ত সর্বত্র হাতির উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। মগধ রাজ্যের হাতির নামডাক শুনে গ্রিক সেনারা অগ্রসর হতে না চাওয়ায় আলেকজান্ডারকে ফিরে যেতে হয়েছিল। পাল ও সেন রাজাদের হাতিবহরের কথা তাঁদের সভাকবিরা প্রশস্তি ও তাম্রলিপিতে লিখে গেছেন। মোগল যুগের চিত্রকলায় মোগল হাতির দাপট ও সদম্ভ পদচারণ আজও সম্ভ্রম আদায় করে। বাংলার নবাবদেরও ছিল যুদ্ধে সুশিক্ষিত হাতির বিশাল বাহিনী; পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার হস্তী বাহিনী ষড়যন্ত্রকারীদের কূটচালে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল।

উপমহাদেশের প্রায় সব ঐতিহাসিক যুদ্ধের জয়-পরাজয়ে হাতির বিশাল ভূমিকা ছিল। ভারতে মুসলমান অভিযানের সাফল্যের কারণ অনুসন্ধানে ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মো. হাবিবুল্লাহ মুসলমান বাহিনীর সুশিক্ষিত ঘোড়ার ত্বরিতগতির আক্রমণকে বিজয়ের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিপরীতে ভারতীয় বাহিনীর হাতিবহরের ওপর নির্ভরশীলতাকে স্থানীয় রাজাদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন। দ্রুতগতিসম্পন্ন ঘোড়ার তুলনায় বিশাল ও ধীরগতির হাতি আগন্তুক মুসলমান বাহিনীর সঙ্গে শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠেনি। উত্তর ভারতের শুষ্ক আবহাওয়ায় ঘোড়ার এই সুবিধা নদীমাতৃক, বৃষ্টিবহুল জলাজঙ্গুলে বাংলাদেশের ভেজা যুদ্ধের মাঠে অনেকটাই অকেজো হয়ে পড়ে। ইংরেজ বণিক র‍্যালফ ফিচের (১৫৮৩-১৫৯০) বর্ণনায় এর প্রমাণ মেলে; তিনি আকবরের জন্য রানি এলিজাবেথের চিঠি নিয়ে হিন্দুস্থানে এসেছিলেন।

ফিচ দুবার বাংলায় আসেন—১৫৮৩ ও ১৫৮৪ সালে। তখন দখলদার মোগল শাসন সবেমাত্র বাংলায় ভিত গাড়ার চেষ্টা করছে; আর দক্ষিণ বাংলায় স্বাধীনতাকামী বারভূঁইয়াদের সঙ্গে মোগলদের যুদ্ধ লেগেই রয়েছে। সম্মুখযুদ্ধ ছাড়াও বারভূঁইয়ারা আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের ধরনে আকবরের বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত রাখার কৌশল নিয়েছিল। স্থানীয় অধিবাসীদের আকবরের প্রতি বিরোধিতা ফিচের চোখে ভালোভাবেই ধরা পড়েছিল। আকবরের ঘোড়াগুলোর নাকাল হওয়ার ঘটনাও তাঁর রচনায় উঠে এসেছে: ‘...বাংলাদেশের চাটিগাঁও থেকে আমি বাকোলোতে আসি। ...বাকোলো থেকে আমি সিরিপুরে যাই। এটি গঙ্গা নদীর ওপর অবস্থিত। রাজার নাম চাঁদ রায়। কাছাকাছি সব দেশের লোকেরা জালালউদ্দিন আকবরের বিরোধী। এ দেশে এত নদী আর দ্বীপ যে লোকে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে পালিয়ে যায়। আকবরের ঘোড়সওয়ারীরা তাদের কিছুই করতে পারে না...।’

বারভূঁইয়ারা নিজেদের কোনো ইতিহাস লিখে রাখেননি। সে সময়কার অবস্থা জানার উপায় পর্যটক ইবনে বতুতার বিবরণ ও চীনের সরকারি প্রতিবেদন। মোগল সেনানী মির্জা নাথান যদি বাংলার মোগল বনাম বারভূঁইয়ার যুদ্ধবিগ্রহ ও তাঁদের আত্মসমর্পণের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস না লিখতেন, তাহলে বারভূঁইয়াদের ইতিহাস বা তাঁদের হাতির বহর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত। বারভূঁইয়াদের বশ্যতা আদায়ে মোগল বাহিনীর হয়ে বাংলাদেশে ১৬ বছর যুদ্ধ করেন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ হিসেবে তাঁর লেখার মূল্য অপরিসীম। এই প্রামাণ্য দলিল না থাকলে বারভূঁইয়াদের বীরত্বগাথা, আত্মত্যাগ ও স্বাধিকার রক্ষার্থে জীবনপণ যুদ্ধ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেত।

মির্জা নাথানের বইটির নাম বাহারীস্তান-ই-গায়বী। বীর বারভূঁইয়াদের সর্বশক্তি দিয়ে মোগল শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, ক্রমান্বয়ে পরাজয় এবং আত্মসমর্পণের লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে খাজা ওসমানের আমরণ প্রতিরোধ ও দেশের স্বাধিকারের জন্য জীবনদানের অসামান্য কাহিনি তিনি লিখেছেন। লিখেছেন পূর্ববাংলার নদ-নদী, জলাজঙ্গল ও পাখপাখালির কথা। এই বই থেকেই প্রথম জানা যায়, জাহাঙ্গীরের আমলে মোগলদের অধিকার থেকে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে প্রকৃত নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মুসা খাঁ মসনদে আলা ও তাঁর মিত্ররা এবং ভাটির অবিসংবাদিত নেতা খাজা ওসমান। অনেকের মতে, মুসা খাঁ ও খাজা ওসমান ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোগলদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অংশ নিলে বাংলার ইতিহাস ভিন্ন পথে মোড় নিত।

এই যুদ্ধে বাংলার হস্তী বাহিনীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাথান সেই সব হাতির কথাও লিখেছেন। তিনি ছিলেন পশুপ্রেমী এবং তাঁর ছিল অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। হাতির জীবনপ্রণালি, মর্জি-মেজাজ ও যুদ্ধক্ষেত্রে তার আবশ্যিকতা তিনি বুঝতেন; যুদ্ধক্ষেত্রে হাতিকে উজ্জীবিত করার প্রক্রিয়াও ছিল তাঁর নখদর্পণে। মোগলদের সঙ্গে বারভূঁইয়াদের যুদ্ধে হাতির গুরুত্ব বোঝার একটি মাপকাঠি হলো আত্মসমর্পণের শর্তাবলি, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল হাতি-সম্পর্কিত শর্ত। শর্ত ছিল—পরাজিত ভূঁইয়াদের হাতিশালার সব ‘ফিলান-ই-দান্দানদার’ অর্থাৎ সব দাঁতাল হাতি মোগল ফৌজের হাতে সমর্পণ করতে হবে, সঙ্গে থাকবে এক পুত্র বা ভাই। আত্মসমর্পণকারী ব্যবহারের জন্য কয়েকটি মাদি হাতি রাখতে পারবে। বেশির ভাগ নৌকা বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছিল এবং বড় নৌকা ভেঙে ফেলা হচ্ছিল। হাতি ও নৌকা থাকলে বাংলার জলাজঙ্গলে ঘোড়া নয়, হাতিই যুদ্ধের প্রধান সহায়। বন-জঙ্গল ও অগভীর জলা ভেঙে ঘোড়ার পক্ষে চলাচল প্রায় অসম্ভব। শুধু যুদ্ধের মাঠে নয়, ভারী কামান, গোলাবারুদ ও রসদ নিরাপদে বহনের জন্যও হাতি গুরুত্বপূর্ণ। হাতি নিজেই একটি মারাত্মক যুদ্ধাস্ত্র—আধুনিক ট্যাংকের মতো পদাতিক ও ঘোড়সওয়ার বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করতে বেজায় পারঙ্গম।

মির্জা নাথান চর মারফত প্রতিপক্ষের হাতির হিংস্রতা ও রণক্ষেত্রে দক্ষতা সম্পর্কে আগাম খবর রাখতেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তিনি সেনাদল সাজাতেন, যাতে সুযোগমতো ধারালো তরবারি দিয়ে হাতির পা কেটে অকেজো করা যায় এবং ভূঁইয়াদের হাতির আক্রমণে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি কম হয়। তিনি তাঁর গ্রন্থে ওসমানের হাতির যুদ্ধনৈপুণ্য নিয়ে ‘ওসমানের হাতির অদ্ভুত কৌশল’ নামে একটি উপপরিচ্ছেদ লিখেছেন। ইতিহাসবিদ আর সি মজুমদার খাজা ওসমানের দুটি প্রধান হাতির নাম উল্লেখ করেছেন—বাজ ও বাখতা। মির্জা নাথান ওসমানের আরও কয়েকটি তারকা হাতির নাম লিখেছেন—অনুপা, সিঙ্গালি বা সিংহলি, দাস্তা, শতরঞ্জি ইত্যাদি। মোগল হাতিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাঘদলন, বালসুন্দর, চঞ্চল, ফাতহা, গোপাল ও রণসিঙ্গার। সিলেটের প্রখ্যাত ভূঁইয়া বায়েজিদের প্রধান হাতির নাম আবর; এ ছাড়া তাঁর আরও নয়টি প্রধান হাতি ছিল। নাথান লিখেছেন, বাঙালিদের হাতিগুলো মোগল সেনাদের অনেকবার ছত্রভঙ্গ করেছে।

খাজা ওসমান জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মোগলদের আত্মসমর্পণের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন দিয়ে অনন্য বীরত্বগাথা রেখে গেছেন। মির্জা নাথানের লেখা থেকে ওসমানের প্রতি মোগলদের শেষ চরমপত্রের কিছু অংশ তুলে ধরা যায়: ‘...যদি তিনি [খাজা ওসমান] বাদশাহ সালামতের [সম্রাট জাহাঙ্গীর] কাছে আত্মসমর্পণ করেন, তবে তাঁকে ক্ষমা করা হবে এবং তিনিও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পাবেন...বাদশাহর আদেশে পাঁচ হাজারি মনসবদারের মর্যাদা গ্রহণ করা হবে। তাঁর জন্য বাদশাহর পক্ষ থেকে চিরস্থায়ী অনুগ্রহ।’ বারবার তাগাদা সত্ত্বেও খাজা ওসমান বশ্যতা স্বীকার করেননি।

মির্জা নাথান ওসমানের কথা বস্তুনিষ্ঠভাবে লিখেছেন; পরাজিত শত্রুকে বিদ্বেষবাণে বিদ্ধ করেননি, তাঁর চরিত্রহরণও করেননি। পূর্ব তথ্য বাতিল করে নাথানই জানান যে দৌলাম্বাপুরের যুদ্ধে ওসমান বন্দুকের গুলিতে নয়, তিরের আঘাতে অন্ধ হয়ে যান। তবু তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সম্ভবত এই যুদ্ধক্ষেত্রেই তাঁর মৃত্যু হয়; তাঁর লাশ নিয়ে পুত্র ও ভাইয়েরা অকস্মাৎ যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেন। চাপের মুখে থাকা মোগল বাহিনী প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি যে প্রতিপক্ষ যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর ওসমানের পুত্ররা ফিরে এসে প্রবলবেগে মোগলদের আক্রমণ করেন। দৌলাম্বাপুরের যুদ্ধে ওসমানের হাতির যে যুদ্ধনৈপুণ্য দেখা যায়, তার বিশ্বস্ত বিবরণ দিয়েছেন নাথান। যুদ্ধের এক পর্যায়ে ওসমানের হাতি বাখতা নাথানের জীবন সংশয় করে তুলেছিল; শত্রুপক্ষের হাতি বলে নাথান কোনো অসত্যচারণের আশ্রয় নেননি।

মাতঙ্গের জমিদার পাহলোয়ান ছিলেন সবচেয়ে সাহসী ও বীরযোদ্ধা। তিনি প্রতিপক্ষ মোগল শামসুদ্দিনকে পরাজিত ও নিহত করে নিজেও যুদ্ধে নিহত হন। নাথানের লেখাতেই জানা যায় পাহলোয়ানের বিখ্যাত হাতি বাজের বীরত্বপূর্ণ কাহিনি। বাজ ফটক ভেঙে শত্রুর দুর্গে সহজেই ঢুকে যেত। বাজের পায়ে ঝুলে ঝুলে পাহলোয়ানের সেনারা দুর্গে ঢুকে হাতাহাতি যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। মোগল সেনারা বাজের চারটি পা-ই কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে। বাজ কিন্তু আসন্ন বিপদ টের পেয়েও যুদ্ধের মাঠ থেকে পালায়নি। ঘোড়ার প্রভুভক্তির কথা শুনে আমরা অভ্যস্ত; কিন্তু বাংলার এসব প্রভুভক্ত হাতির আত্মত্যাগের কথা ইতিহাসে খুব কমই লেখা হয়েছে। নাথান ওসমানের প্রধান হাতি বাখতারেও বর্ণনা দিয়েছেন; বাখতা আকারে পাহাড়ের মতো।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দুই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও সাবেক সেনাদের প্ল্যাটফর্ম: দেবাশীষ-

1

নেপালে নতুন বন্যায় ঘরবাড়ি ও সেতু ভেসে গেছে, নিখোঁজ পাঁচ

2

সরকারি ভবনের ছাদে ৩৭০ কোটি টাকার সৌর প্যানেল, রক্ষণাবেক্ষণ ন

3

রংপুরে প্রশাসনের সমালোচনায় এমপি মাহবুবুর রহমান, ভিডিও ভাইরা

4

সাংবাদিকদের দ্রুত অ্যাক্রিডিটেশন প্রদানের আহ্বান অনলাইন এডিট

5

অগ্নিকাণ্ডের ৫ দিন পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ

6

কাতারে বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের নতুন সভাপতি শামীম সম্পাদক সালা

7

সাংবাদিকতা পেশায় রাজনৈতিক দলবাজি বন্ধ করা দরকার: সংস্কার কমি

8

ইন্দোনেশিয়ার ধোঁয়াশায় সিঙ্গাপুরগামী ফায়ারফ্লাইয়ের ফ্লাই

9

‘আমি ভয়ও পাচ্ছি, কারণ ইসরায়েলিদের বিশ্বাস করি না’

10

ঢাবি ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ

11

ট্রাম্পের সংবাদ কাভারেজ বন্ধের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বি

12

বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান কোনো ভেদাভেদ নেই: স

13

সৌদি হামলায় বগুড়ার শাহেদ নিহত, স্ত্রীর অপেক্ষা স্বামীর মরদেহ

14

গাজীপুরে লে-অফের প্রতিবাদে শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ

15

নানা কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস পালিত

16

পূজার ছুটিতে তৈরি পোশাক কারখানার উৎপাদন চলবে

17

১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্

18

নতুন বছরের শুরুতেই যেসব ফোনে বন্ধ হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ

19

টিকটকে পরিচয়, ইউপি সদস্যের সঙ্গে পালালেন গৃহবধূ

20