
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগ অন্তর্ভুক্ত না থাকার বিষয়টি সম্প্রতি সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির বৈঠকে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সামনে প্রশ্ন আকারে উত্থাপিত হয়েছে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক রিজওয়ান-উল-আলম এক মতামত নিবন্ধে এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, ১৯৯৮ সালে বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে প্রশিক্ষণকালে আইনজীবী গাজী শামসুর রহমানের বই পড়ে প্রথম জানতে পারেন যে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫২-এ রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগ নেই।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫২ অনুযায়ী, রাষ্ট্র বলতে সংসদ, সরকার এবং সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষকে বোঝায়। বিচার বিভাগ এখানে বাদ পড়েছে। অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তিনটি অংশ—সংসদ আইন প্রণয়ন করে, সরকার তা বাস্তবায়ন করে এবং বিচার বিভাগ আইন ব্যাখ্যা করে অন্য দুই অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২-এ বলা হয়েছে, রাষ্ট্র বিচার বিভাগকে নির্বাহী থেকে আলাদা রাখবে। মাসদার হোসেন মামলার রায়েও বিচার বিভাগীয় চাকরিকে সাধারণ সরকারি চাকরির মতো নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণেতারা গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ক্ষমতা পৃথকীকরণের লক্ষ্য রেখেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগ না থাকায় বিচার বিভাগকে প্রায়ই সমান অংশীদার হিসেবে না দেখে প্রয়োজনমতো ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার সুপ্রিম কোর্টের অধীনে একটি সচিবালয় গঠনের অধ্যাদেশ জারি করেছিল, যা নতুন সরকার বাতিল করেছে। এতে বোঝা যায়, বিচার বিভাগ যখন প্রশাসনিক স্বাধীনতা চায়, রাজনৈতিক ক্ষমতা তা ফিরিয়ে আনে।
একটি আপত্তি হলো, বিচার বিভাগকে রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করলে 'রাষ্ট্র বনাম অমুক' মামলায় আদালত নিজেই পক্ষ হয়ে যাবে। কিন্তু ফৌজদারি মামলায় 'রাষ্ট্র' শব্দটি জনস্বার্থের প্রতীক মাত্র; আসল পক্ষ সরকার। তাই 'সরকার বনাম অমুক' বলা বেশি যথাযথ। সংজ্ঞায় বিচার বিভাগ যোগ করলে বিচারক মামলার পক্ষ হন না, বরং আগের মতো প্রসঙ্গ অনুসারে ব্যতিক্রম রাখা যায়। আন্তর্জাতিক মামলাতেও কোনো সমস্যা নেই, কারণ বিদেশে বাংলাদেশকে এক রাষ্ট্র হিসেবেই দেখা হয়।
সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে যে, অনুচ্ছেদ ১৫২-এ রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় বিচার বিভাগ যোগ করে বলা যেতে পারে: রাষ্ট্র মানে সংসদ, সরকার, বিচার বিভাগ ও সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি একটি লাইন যোগ করা যায় যে, সাধারণ বিচারিক রায় শুধু এই কারণেই সরকারি সিদ্ধান্তের মতো চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। এতে বিচারকদের নিরপেক্ষ ভূমিকা অক্ষুণ্ন থাকবে এবং এটি অনুচ্ছেদ ২২ ও সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ হবে।
এই পরিবর্তন বড় কোনো সংস্কার নয়; এতে নতুন সচিবালয় তৈরি হবে না, নিয়োগ পদ্ধতিও বদলাবে না। শুধু দীর্ঘদিনের নীরবতা কাটবে। যে সংবিধান ক্ষমতা পৃথকীকরণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলে, সেখানে বিচার বিভাগকে বাদ রাখা অসঙ্গত। সংবিধানের শব্দ মানুষের চিন্তা গড়ে; তাই পাঠ্য যখন বিচার বিভাগকে বাইরে রাখে, তখন তার স্বাধীনতাকে অনুগ্রহ হিসেবে দেখার সুযোগ বাড়ে। বর্তমানে সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় এই ছোট ফাঁকটি বন্ধ করার সুযোগ রয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৫২-এ বিচার বিভাগ যোগ করা মানে স্বীকার করা যে সংবিধানের তিনটি অংশই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: রিজওয়ান-উল-আলম, সহযোগী অধ্যাপক, গণমাধ্যম, যোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। মতামত লেখকের নিজস্ব।