
গাইবান্ধায় অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস বিক্রির ঘটনা অব্যাহত থাকায় অ্যানথ্রাক্সের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। জেলার একাধিক উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে অর্থদণ্ড ও মাংস জব্দ করা হলেও একই ধরনের ঘটনা বারবার সামনে আসছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, অসুস্থ পশু জবাই ঠেকাতে বিদ্যমান নজরদারি কতটা কার্যকর।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়াদের সংখ্যা ৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বাছোহাটি গ্রামে একটি অসুস্থ ফ্রিজিয়ান গাভী জবাই করে মাংস কাটাকাটিতে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ অংশ নেন। কয়েক দিন পর তাদের কারও কারও শরীরে ফোসকা দেখা দেয়। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগে চিকিৎসা নিতে গেলে তাদের সন্দেহভাজন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
এ ঘটনার পর গত ২৫ সেপ্টেম্বর রোগের বিস্তার অনুসন্ধানে মাঠে নামে ঢাকা ও রংপুরের সমন্বয়ে গঠিত রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ছয় সদস্যের একটি আউটব্রেক ইনভেস্টিগেশন টিম। পরে তাদের নমুনা ও সেই মাংসের নমুনা পরীক্ষার রিপোর্টে মাংসে ও উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নেওয়াদের সবাই অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত বলে নিশ্চিত করা হয়।
সুন্দরগঞ্জে অসুস্থ গরু জবাইয়ে অংশ নেওয়া ও মাংস খাওয়ায় অনেকের শরীরে অ্যানথ্রাক্স দেখা দেওয়ার পর তৎপর হয় প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগ। সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালায় তারা। তারপরেও বন্ধ হচ্ছে না অসুস্থ গরু জবাই।
সর্বশেষ গত ৩ অক্টোবর সুন্দরগঞ্জে অসুস্থ গরু জবাইয়ের দায়ে উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের গেন্দুরাম গ্রামে হোসাইন মিয়াকে (২০) ৫ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে জবাই করা গরুর মাংস মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। সেখানে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. মোজাম্মেলকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আহরাব আল আকাশ।
এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে একই উপজেলার উত্তর সাহাবাজ গ্রামের অসুস্থ গরু জবাইয়ের দায়ে গরুর মালিক রফিকুল ইসলামের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও ভ্রাম্যমাণ আদালত। অসুস্থ গরু জবাইয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে সেখানেও ভ্রাম্যমাণ আদালতে গরু মালিকের ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন একই ম্যাজিস্ট্রেট।
সূত্র জানায়, পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মেডিকেল সনদ না নিয়ে পশু জবাই করার অপরাধে উপজেলার বিভিন্ন বাজারের ছয় কসাইয়ের প্রত্যেকের ২ হাজার এবং একজনের ১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একইসঙ্গে অসুস্থ গরুর মাংস জব্দ করে মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়। দণ্ডিতরা হলেন, বামনডাঙ্গা হলমোড়ের কসাই ফজলু মিয়া, পৌরসভার আব্দুল্লাহ, শাহিন মিয়া, রামভদ্রের সফিউল ইসলাম, রামগঞ্জ বাজারের রেজাউল ইসলাম এবং বামনডাঙ্গা সুইচ গেটের জহুরুল ইসলাম।
এ ছাড়া একইদিন ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাটে একটি মাংসের দোকানে অভিযানে ব্যবসায়ী জেলাল শেখকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা ও ৪৫ কেজি মাংস জব্দ করে পুঁতে ফেলা হয়। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা তানভীক জাহান ও স্যানিটারি ইন্সপেক্টর গোলাম রাব্বানীর মাধ্যমে মাংসগুলো অসুস্থ গরুর বলে নিশ্চিত হয়ে এই অভিযান পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিস রওজাতুল জান্নাত।
অসুস্থ গরু জবাইয়ের অপরাধে জড়িতদের জরিমানা ও মাংস জব্দের মতো কার্যক্রমে কিছুটা স্বস্তি মিলছে ভোক্তা পর্যায়ে। কিন্তু উদ্বেগ কমছে না তাদের। ক্রেতাদের প্রশ্ন, আক্রান্ত পশু জবাইয়ের আগেই কেন তা শনাক্ত করা যাচ্ছে না? সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিক ও ভোক্তারা। অভিযোগ রয়েছে প্রাণিসম্পদের সেবা নিয়েও।
গাইবান্ধার প্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক রজতকান্তি বর্মন বলেন, একটি অসুস্থ গরু জবাইয়ের পর তা শনাক্ত হচ্ছে, কিন্তু তার আগে কেন শনাক্ত করা যাচ্ছে না? এখানে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বপালনে যথেষ্ট অবহেলা রয়েছে। কেননা, জবাই করা অসুস্থ গরু/গাভীটি তো কারো বাড়িতে বা খামারে ছিল। সেখানে কেন শনাক্ত করা গেলো না। সেক্ষেত্রে সন্দেহ থাকাটা ভুল নয়, অগোচরে অনেক অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস বেচা-কেনা হচ্ছে না।
সচেতন নাগরিক ও বেসরকারি এনজিওতে চাকরিজীবী সিরাজ উদ্দিন বলেন, সুন্দরগঞ্জের ঘটনার পর গরুর মাংস ক্রয়ে নিজেদের মধ্যেও সন্দেহ ও সংশয় কাজ করছে। প্রাণিসম্পদের লোকদের দায়িত্বশীল হতে হবে।
চিকিৎসা সেবায় সরকারি প্রাণিসম্পদ বিভাগের মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসা পদ্ধতি ও সেবার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা এবং দৃশ্যমান পরামর্শ সেবা থাকলেও মাঠপর্যায়ে সেবা পৌঁছায় না তাদের। যদিও তাদের দাবি জনবলের চরম সংকটে রয়েছে দপ্তরটি।
রাধাকৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, কোনোদিন দেখিনাই এই গ্রামে পশু হাসপাতালের কোনো লোক আসছে। কোনো পরামর্শ দেওয়ার জন্য বা মিটিং করার জন্য। আমাদের গরু অসুস্থ হলে আমরা স্থানীয় কিছু ডাক্তার আছে, তাদের কাছে চিকিৎসা নিই। তারা তাদের মতো করে টাকা নেন।
সদরের কুপতলা ইউনিয়নের পূর্ব চাপাদহ গ্রামে মাঝারি খামারি মোশাররফ হোসেন বলেন, গত ৬ মে আমার ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের একটি বিদেশি জাতের ষাঁড় গরু লাম্পিতে মারা গেছে। একইসঙ্গে আরও ১৪/১৫টি গরুতে লাম্পি হয়েছিল। আমি প্রাণিসম্পদের কোনো সহযোগিতা পাইনি। তারা কোনোদিন গ্রামে খোঁজ নিতে আসে না। তাদের উচিৎ খামারিদের এবং যারা গরু পালে (লালন-পালন) করে তাদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখভাল করা। প্রাণির সব ধরনের অসুস্থতায় চিকিৎসা ও পরামর্শ দেওয়া।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. কে. এম. ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, গরু মালিক ও কসাইদের সচেতন করার লক্ষে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে উঠান বৈঠকসহ সচেতনতামূলক বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া ‘অসুস্থ গরু জবাই করা হয়েছে’-এমন বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা ও মাংস জব্দে জোর দেওয়া হয়েছে।
সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিস রওজাতুন জান্নাত ঢাকা পোস্টকে বলেন, অসুস্থ গরু জবাই করা ও মাংস বিক্রি বন্ধে প্রচারনা করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা রক্ষায় আমাদের অভিযান অব্যহত রয়েছে। এ সময় অসুস্থ গরু জবাই ও তার মাংস বেচা-কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ডিএলও) ডা. জোবাইদুল কবীর ঢাকা পোস্টকে বলেন, সম্প্রতি এ রোগের নতুন করে ১ লাখ ৪ হাজার ভ্যাকসিন বরাদ্দ পাওয়া গেছে এবং আমাদের যথেষ্ট মজুদ রয়েছে। পশু পালনকারী ও খামারিদের সচেতন করে ভ্যাকসিন প্রয়োগে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের দপ্তরের যথেষ্ট জনবল সংকট। যা আছে তা নিয়েই আমরা সব ধরণের সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, অসুস্থ গরু জবাইয়ের ক্ষেত্রে কসাই বা গরুর মালিকদেরও সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি ভোক্তারাও সচেতন হলে সম্মলিত প্রচেষ্টায় এর প্রবনতা ঠেকানো সম্ভব।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর একই উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর গ্রামের মাহবুবুর রহমানের একটি রোগাক্রান্ত গরু জবাই করা হয়। সেখানে মাংস কাটাকাটির কাজে অংশ নেওয়া স্থানীয় ১১ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেয়। পরে তাদের গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ৫ অক্টোবর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোজিনা বেগম (৪৫) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়।