
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে চলমান বিক্ষোভ ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে আটক করার পর ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। শনিবার সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে মমতাকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তাঁর সঙ্গে আটক বাকি তৃণমূল নেতাদেরও মুক্তি দেওয়া হয়। জাফরপুর কালান পুলিশ স্টেশন থেকে কেজরিওয়ালকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে শনিবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপক, ছাত্রনেতা নেহা বোরা, ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি, চারজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মানিক সরকার ও পিনারাই বিজয়ন।
অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরাকে আটকের পর ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ পোস্ট দিয়ে এ কথা জানিয়েছেন। নেহা বোরা লিখেছেন, ‘পুলিশ আমার ফোনটি নিয়ে নিয়েছিল। এখন আমি আমার ফোন ফেরত পেয়েছি। ময়দান গড়ি থানা থেকে নারীদেরও মুক্তি দেওয়া হয়েছে।’
সিইসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারী অন্যতম মুখ নেহা বোরাকে শনিবার সকালে আটক করা হয়েছিল। ২৯ বছর বয়সী এই নারী দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী এবং সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন এআইএসএ-এর সভাপতি।
এদিকে মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দান বিক্ষোভের সময় অভিনেতা ইমরান খানকে আটক করা হয়েছে। আটকের পর পুলিশ ভ্যান থেকে সেলফি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘মনে হচ্ছে আমি ড্রাইভে যাচ্ছি।’ ইমরান খান এই বিক্ষোভ নিয়ে সরব ছিলেন এবং আগের প্রতিবাদ মিছিলেও সংহতি জানিয়েছিলেন।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেকে বাড়ি ফেরার যাত্রায় সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। দিপকেকে শনিবার দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়। তিনি যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে যোগ দিতে মুম্বাই থেকে বিমানযোগে সকালে দিল্লিতে পৌঁছান। পরে খবর পাওয়া যায়, মহারাষ্ট্রে গ্রামের বাড়িতে তাঁর দাদি সাবিত্রীবাঈ শঙ্কর মারা গেছেন। দাদির বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।
দিল্লি পুলিশ জানায়, ‘যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভের অনুমতি ছিল না। ওই বিক্ষোভে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন বলে তাঁকে আটক করা হয়। পরে অভিজিৎ দিপকের দাদির মৃত্যুর দুর্ভাগ্যজনক খবর পাওয়া যায়। যথাযথ সংবেদনশীলতার সাথে তথ্যটি তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে জানানো হয় এবং শেষকৃত্যের সম্ভাব্য সময়ও তাঁকে অবহিত করা হয়। মানবিকতার খাতিরে তাঁর নিজ শহরে ফেরার যাত্রায় সম্ভাব্য সহায়তার প্রস্তাবও তাঁকে দেওয়া হয়েছে।’ তবে দিপকের কী সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন তা উল্লেখ করেনি দিল্লি পুলিশ।
তরুণদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশে বলেছেন, ‘মি. মোদি, আপনার যা খুশি করুন। সব পুলিশকে ডাকুন: ১০,০০০, ২০,০০০, ৫০,০০০, আপনার যা ইচ্ছা। সব নেতাকে গ্রেপ্তার করুন। সব তরুণদের গ্রেপ্তার করুন। আমাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করুন।’
এক এক্স বার্তায় রাহুল গান্ধী বলেন, ‘আমি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নরেন্দ্র মোদি এবং আরএসএসের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছি। আপনি যেভাবে আপনার প্রতিপক্ষকে বুঝবেন, আমি তাদের ঠিক সেভাবেই বুঝি—একদম ভেতর থেকে, আমার হাতের তালুর মতো। এই লোকগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য হলো কাপুরুষতা।’ তিনি আরও বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, মোহন ভাগবত, জ্ঞানেশ কুমার এবং অজিত দোভাল—এই গল্পের খলনায়কেরা—ধীরে ধীরে দেখতে পাচ্ছেন যে তাঁদের চারপাশের জায়গা ছোট হয়ে আসছে। আমরা সেই জায়গা ছোট করে আনছি।’
বিক্ষোভ ঘিরে আটক সবাইকে আগামীকালের মধ্যে মুক্তি দেওয়া না হলে অনশন বা পদযাত্রা কর্মসূচির কথা বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক। ম্যাগসাইসাই পুরস্কারজয়ী এই শিক্ষাবিদ এক এক্স বার্তায় বলেছেন, ‘গতকাল যখন আমি আজকের বিক্ষোভে ঐক্য ও শান্তির জন্য আবেদন জানিয়ে একটি বার্তা পোস্ট করেছিলাম, তখন কল্পনাও করতে পারিনি যে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র একটি অঘোষিত জরুরি অবস্থার মধ্যে পড়বে।’
লাদাখের এই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিবেশ আন্দোলনকর্মী আরও বলেন, ‘আন্দোলনটি পরিচালনার জন্য এত নেতা দেখে খুশি হয়েছিলাম, কিন্তু এখন জানতে পেরেছি যে তাঁদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমি আশা করি, গ্রেপ্তার সবাইকে শিগগিরই মুক্তি দেওয়া হবে। আগামীকালের মধ্যে তাঁদের মুক্তি দেওয়া না হলে আমি অনশন বা পদযাত্রা কর্মসূচির কথা বিবেচনা করতে বাধ্য হবো।’
এদিকে দিল্লিতে বিক্ষোভের মধ্যে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) উত্তর প্রদেশের সাবেক বিধায়ক বিক্রম সিংহের মেয়ে যশস্বিনী রাজে সিংকে আটক করেছে পুলিশ। আটক হওয়ার পর এক্সে যশস্বিনী লিখেছেন, ‘পার্কে বসে থাকার কারণে বাংলা সাহিবের কাছ থেকে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে কেশব পুরম থানায় রাখা হয়েছে।’ তিনি উত্তর প্রদেশের ফতেহপুর সদর আসনের প্রভাবশালী বিজেপি নেতা ও সাবেক বিধায়ক বিক্রম সিংহের মেয়ে।
এর আগে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে জুন-জুলাই মাসে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়ে বেশ আলোচনায় আসেন যশস্বিনী। সে সময় সিজেপির প্রচারকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন জানিয়েছিলেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিল্লিতে আটক করার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। সিইসির পদত্যাগের দাবিতে ধর্নায় বসার পর দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউ বাসস্ট্যান্ডের কাছ থেকে মমতাকে আটক করে পুলিশ। তাঁর সঙ্গে আটক হওয়া সাংসদের মধ্যে রয়েছেন ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন, প্রতিমা মণ্ডল, সামিরুল ইসলাম এবং সাকেত গোখলে।
দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির (এএপি) নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে লোধি এস্টেটে নিজ বাড়ির সামনে থেকে আটক করা হয়। এ নিয়ে সাবেক চার মুখ্যমন্ত্রীকে আটক করা হলো। এর আগে আটক হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার ও কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন।
অভিজিৎ দিপকের নেতৃত্বে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিল্লির যন্তর মন্তর এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। পুরো দিল্লিকে কার্যত দুর্গে পরিণত করতে মোতায়েন করা হয়েছে দিল্লি পুলিশ ও সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্সেসের ৪০ হাজারের বেশি সদস্য। বসানো হয়েছে ব্যারিকেড ও কাঁটাতারের স্পাইক স্ট্রিপ।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) অনিয়মের অভিযোগ এনে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে এ আন্দোলন চলছে। এই পরিস্থিতিতেও বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।