
দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে মাত্র এক টাকা সম্মানী নিয়ে শিক্ষাদান করা গাইবান্ধার লুৎফর রহমান এবার পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দেশের ১০২ জন গুণী শিক্ষকের সঙ্গে তাকেও বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে সরকার। গতকাল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার হাতে সম্মাননা তুলে দেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সম্মাননাপ্রাপ্ত প্রত্যেক শিক্ষককে দেওয়া হয় ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র। লুৎফর রহমান গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা। ব্রহ্মপুত্র নদীর বাঁধঘেঁষা এলাকায় বসবাস করা এই মানুষটির নিজের জীবনও কেটেছে অভাব আর সংগ্রামের মধ্যে। নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে একসময় আশ্রয় নিতে হয়েছিল বাঁধের পাশে।
লুৎফর রহমানের শিক্ষাসেবার যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৪ সালে। অর্থের অভাবে নিজের পড়াশোনা বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারেননি। তবে নিজের সেই না-পাওয়ার কষ্টই অন্য শিশুদের জন্য কিছু করার প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থের অভাবে কোনো শিশু যেন পড়াশোনা থেকে ছিটকে না পড়ে—এই ভাবনা থেকেই শুরু করেন পড়ানো। প্রথম থেকেই তার শিক্ষাসেবার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ১ টাকা। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কাছ থেকে প্রতিদিন মাত্র ১ টাকা করে সম্মানী নেন তিনি। সময়ের সঙ্গে বাজারে সবকিছুর দাম বেড়েছে, বেড়েছে শিক্ষার ব্যয়ও। কিন্তু বাড়েনি লুৎফর রহমানের পড়ানোর পারিশ্রমিক।
তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নন। নেই কোনো বড় কোচিং সেন্টার, নেই চকচকে শ্রেণিকক্ষ। তার পাঠশালা কখনো কোনো বাড়ির উঠান, কখনো গ্রামের কোনো নিরিবিলি জায়গা। প্রয়োজন হলে নিজেই সাইকেলে চড়ে পৌঁছে যান শিক্ষার্থীর বাড়িতে। স্কুলে পিছিয়ে পড়া এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের শিশুরাই মূলত তার শিক্ষার্থী। তার কাছে পড়েছে একাধিক প্রজন্মের শিক্ষার্থী। সেই শিক্ষার্থীদের কেউ হয়েছেন চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক। কেউ আবার সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক না হয়েও লুৎফর রহমান পাবেন অবসর ভাতা। তাকে অবসরভাতা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই শিক্ষকের অবসর ভাতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন।
সম্মাননা পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় লুৎফর রহমান বলেন, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। ’৭৪ সালে দেশে অভাব ছিল। শিক্ষার্থীরা পড়তে-লিখতে পারতো না। তাদের উঠানে-বাড়িতে যেয়ে লেখাপড়া শিখিয়েছি। টাকা পয়সাও দিতে পারতো না। ১ টাকা নিতাম। কেউ দিতে পারতো, কেউ পারতো না। আমি বলতাম- বাবা শিক্ষিত হও, শিক্ষা ছাড়া জাতি উন্নত হতে পারে না। শিক্ষা ছাড়া নামাজও হবে না। আমার ছাত্র সচিব, প্রফেসর, ইউএনও পর্যন্ত আছে। শুধু পড়ালে হবে না, পড়ানোর সঙ্গে লেখাতে হবে। আমি এভাবে পড়াই।
তিনি আরও বলেন, আমি একটা বাড়িতে গিয়েছিলাম। বলে, স্যার আমার ছেলে ক্লাস ফাইবে পড়ে। আমি বললাম পড়তো বাবা। সে ইংরেজি রিডিং পড়লো কিন্তু বানান জানে না। বর্তমান শিক্ষকরা গাইডবই দিয়ে পড়ায়। খালি মুখস্থ করছে, আর কিছু পারে না। আরেকটা ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, ক্লাসে এক ছাত্রকে স্যার বলেছেন- কোনোদিন বড় হতে পারবি না। সে আমার কাছে এসে দুঃখ করে এই কথা বলেছিল। আমি ওই ছাত্রকে পড়াইছি। সে এখন কারমাইকেল কলেজে পড়ে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে গুণী এই শিক্ষক বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সালাম জানাই। এমন মানুষ হয় না। গাইবান্ধা থেকে ঈদের দিন ডিসি গেছে আমার কাছে। বলেন, স্যার (প্রধানমন্ত্রী) ঈদের উপহার দিয়েছেন। ১০ হাজার টাকা, ছেলে মেয়েদের জন্য খাবার দিছে। আমার স্ত্রী, ছেলে দেখে অনেক খুশি।
এবার বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ১০২ জন শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি, বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা, কৃষি ও প্রকৌশল শিক্ষার শিক্ষকরা রয়েছেন। এর পাশাপাশি বিশেষভাবে অবদান রাখা শিক্ষাব্রতীদেরও সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। লুৎফুর রহমান ছাড়াও ‘রমণী কান্ত পাঠশালা’র রমণী কান্ত বেপারী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষায় অবদান রাখা প্রায়াস ইনস্টিটিউট অব স্পেশাল এডুকেশনের সহকারী শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হোসেন খানকে বিশেষ ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দেওয়া হয়।
সম্মাননার জন্য শিক্ষকদের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বাছাই করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পৃথক বিচারক ও সার্চ কমিটি কাজ করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া, শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, নাগরিকদের সর্বজনীন আবাসন অধিকার নিশ্চিত এবং নিরাপদ করতে বর্তমান সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’ প্রতিপাদ্যে ‘বিশ্ব বসতি দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের লবিতে তিনদিনব্যাপী আবাসন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলায় আবাসন ও নির্মাণ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থা অংশ নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন এবং পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শহর বন্দর নগরে প্রতিনিয়ত মানুষের বসতি ও বসবাস বেড়েই চলছে। অস্বীকার করার উপায় নেই বর্তমানে রাজধানী ঢাকা ওভার পপুলেটেড। দেশের অন্যান্য শহরগুলোতেও প্রায় একই অবস্থা। শহরাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি মানুষের বসবাস। এমন বাস্তবতায় ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’— এই ধারণাটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। শহরগুলোতে সব মানুষের জন্য নিরাপদ, মানসম্মত, সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও সুপরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা জরুরি। ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার সম্ভাব্য সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সকলের জন্য বাসযোগ্য, সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত, নিরাপদ, মৌলিক সেবা-পরিষেবা সংবলিত বাসস্থান তথা সর্বজনীন আবাসন নাগরিকদের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত এবং নিরাপদ করতে বর্তমান সরকার দৃঢ প্রতিজ্ঞ।
তিনি বলেন, পরিকল্পিত, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গড়ে তোলা বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য বাসযোগ্য, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের ব্যবস্থাও গুরুত্বের সঙ্গে সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। পরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন নিশ্চিত করা এবং সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বাসস্থান সুবিধা প্রদান বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সেই লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। সরকারপ্রধান বলেন, সকলের জন্য বাসযোগ্য, সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত, নিরাপদ, মৌলিক সেবা-পরিষেবা সম্বলিত বাসস্থান তথা সর্বজনীন আবাসন নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার। নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ব্লকভিত্তিক আবাসন উৎসাহিত করার পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক পার্ক, খেলার মাঠ স্থাপন এবং নির্ধারিত জোনে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, সরকার পর্যায়ক্রমে গৃহীত সকল পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে সক্ষম হলে ‘সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থান’ এটি দেশের নাগরিকদের সামনে একটি বিদ্যমান বাস্তবতা হয়ে উঠবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের সভাপতিত্বে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর, জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিস ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেচনিয়াক এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বক্তব্য রাখেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে একটি ‘স্বর্ণচাঁপা’ গাছের চারা রোপণ করেন।
এদিকে, শিক্ষকদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশে কোনো শিশু শিক্ষাবঞ্চিত থাকবে না। আমরা দেশে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই; যেখানে শিক্ষাজীবনের যেকোনো পর্যায় থেকে কেউ কোনো কারণে ড্রপ আউট হলেও যেন কাউকে বেকার থাকতে না হয়, সেটি নিশ্চিত থাকা জরুরি। আপনারা দেখেছেন, শিক্ষা খাত বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথমবারের মতো জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে