
পশ্চিম সাহারায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের মেয়াদ বাড়ানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব রাশিয়ার ভেটোতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতাকে স্বাগত জানিয়েছে মরক্কো। শনিবার (স্থানীয় সময়) মিশনটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, যার ফলে শান্তিরক্ষা মিশনের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
১৯৯১ সালে জাতিসংঘ পশ্চিম সাহারায় যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ এবং স্বায়ত্তশাসন বিষয়ে গণভোট আয়োজনের জন্য ইউএন মিশন ফর দ্য রেফারেন্ডাম ইন ওয়েস্টার্ন সাহারা (মিনুরসো) গঠন করে। শুক্রবার নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবটি ১৫ সদস্যের মধ্যে ১১টি ভোট পেলেও রাশিয়ার ভেটোতে আটকে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে মিশনের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর পাশাপাশি এর নাম থেকে ‘গণভোট’ শব্দটি বাদ দেওয়া এবং মরক্কোর স্বায়ত্তশাসন প্রস্তাবকে ভবিষ্যৎ আলোচনার একমাত্র ভিত্তি করার কথা ছিল। উল্লেখ্য, গত অক্টোবরে নিরাপত্তা পরিষদ পশ্চিম সাহারায় স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব গ্রহণ করে, যেখানে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বায়ত্তশাসন থাকলেও সার্বভৌমত্ব মরক্কোর অধীনে থাকবে।
ভোটের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, ‘২০২৬ সালে গণভোটের জন্য মিশনের নামে থাকা ‘আর’ অক্ষরটি ধরে রাখতে ভেটো ব্যবহার করা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।’ তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটনের প্রস্তাব ‘৫০ বছরের সংঘাতকে এগিয়ে নিতে পারত’ এবং বর্তমান অবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়।
রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া জানান, মস্কো প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেছে কারণ এটি একপাক্ষিকভাবে সুবিধা দেয়। তিনি বলেন, ‘আমরা জোর দিয়ে বলতে চাই, সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত বিষয় নিরাপত্তা পরিষদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারণ করতে পারে না।’ রাশিয়া পরিবর্তন ছাড়াই মিশনের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও তা প্রয়োজনীয় ৯ ভোট পায়নি; পক্ষে ২, বিপক্ষে ১ এবং ১১টি ভোট বিরত থাকে।
মিনুরসো মিশনে ১৫৫ জন সামরিক কর্মী রয়েছে এবং চলতি অর্থবছরে এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। শনিবার এর মেয়াদ শেষ হওয়ায় মরক্কোর রাজপ্রাসাদ এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের কর্মী ও সরঞ্জাম আগামী দিনগুলোতে অঞ্চলটি ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়। তারা পশ্চিম সাহারা ইস্যু নিরাপত্তা পরিষদের বিবেচনা থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানায় এবং যুদ্ধবিরতি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।
অন্যদিকে, আলজেরিয়া মিনুরসোর মেয়াদ বাড়াতে ব্যর্থতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবকে মরক্কোর প্রতি অতিরিক্ত পক্ষপাতদুষ্ট বলে সমালোচনা করে। আলজেরিয়ার জাতিসংঘ প্রতিনিধি রাশিয়াকে ধন্যবাদ জানান এবং যেসব দেশ এই ‘অন্যায়ের’ সঙ্গে একমত হয়নি তাদেরও ধন্যবাদ দেন। তিনি উল্লেখ করেন, আলজেরিয়া লাখ লাখ সাহরাউই শরণার্থীর আশ্রয়স্থল।
পোলিসারিও ফ্রন্টের জাতিসংঘ প্রতিনিধি সিদি ওমর শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, তিনি রাশিয়ার ভেটোকে স্বাগত জানান কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব সাহরাউইদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ক্ষুণ্ণ করত। পোলিসারিও ফ্রন্ট ১৯৭৫ সালে স্পেনের প্রত্যাহারের পর মরক্কোর অন্তর্ভুক্তিকে স্বীকৃতি দেয় না এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোটের দাবি জানিয়ে আসছে। ১৯৭৬ সালে তারা স্বাধীন সাহরাউই আরব গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করে।
দীর্ঘ সংঘাতে কমপক্ষে ১ লাখ ৭০ হাজার আদিবাসী আলজেরিয়ার তিন্দুফে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ১৯৯১ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হলেও ছয় মাসের মধ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। মরক্কো পশ্চিম সাহারাকে নিজ ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ দাবি করে এবং এর ফসফেট ও মৎস্যসম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে।
২০২০ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম সাহারায় মরক্কোর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেন। এরপর মরক্কো ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। বর্তমানে এটি আফ্রিকার একমাত্র ‘অ-স্বশাসিত অঞ্চল’ হিসেবে জাতিসংঘ-স্বীকৃত, যেখানে ১ থেকে ১.৪ লাখ মরক্কোর সামরিক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।
মিনুরসোর মেয়াদ শেষ হওয়ায় মরক্কোর অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শনিবার রয়টার্সের ভিডিও প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিম সাহারার রাজধানী এল আইউনে উৎসবের আবহ বিরাজ করছে। সেখানে ডজন ডজন মানুষ মরক্কোর পতাকা হাতে নিয়ে রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের ছবি প্রদর্শন করেন।
মরক্কোভিত্তিক ইতিহাসবিদ সেলিম বালুয়াতি লাখলুফি আল জাজিরাকে বলেন, ‘জাতিসংঘে কূটনৈতিক অগ্রগতি মরক্কোর কৌশলকে সমর্থন করছে।’ তিনি আরও বলেন, স্বায়ত্তশাসন প্রস্তাবই আলোচনার মূল কাঠামো হয়ে উঠতে পারে, যা স্বাধীনতার দাবিকে আরও দূরে ঠেলে দেবে।
অন্যদিকে, সাহায্য সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে মিনুরসোর মেয়াদ শেষ হলে পশ্চিম সাহারায় সংঘাত বাড়তে পারে। অক্সফাম বলেছে, মিশনের পর্যবেক্ষণ ও উত্তেজনা প্রশমন কার্যক্রম বন্ধ হলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।