
গাজায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা গভীর মানসিক আঘাতে ভুগছেন। তাঁরা একদিকে যেমন স্বজন হারিয়েছেন, অন্যদিকে তেমনই কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ ও স্মৃতিকাতরতায় জর্জরিত। আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট মানার ফাইয়াদ (২৯) ২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিজের ভাই শাদিকে হারান। অপারেশন থিয়েটারে গুরুতর আহত এক ব্যক্তিকে অ্যানেস্থেসিয়া দিতে গিয়ে তিনি দেখেন যে সেই ব্যক্তি তারই ভাই। ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে হাসপাতালটি তার কাছে যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে, ফলে তিনি পেশা চালিয়ে যেতে পারছেন না।
মানার ফাইয়াদ এখন সমুদ্রের ধারে বসে লেখালেখি করে কিছুটা সান্ত্বনা খোঁজেন। তিনি সামাজিক জীবন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন এবং শব্দ ও মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলেন। তিনি গাজা ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন, যাতে সেই দিনের স্মৃতি থেকে মুক্তি মেলে। অন্যদিকে, আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের নার্স খালেদ রাফাত (২৯) ২০২৩ সালের ১৮ অক্টোবর নিজের বাড়িতে ইসরায়েলি হামলায় স্ত্রী, সন্তান, মা ও কয়েকজন ভাইবোনকে হারান। তিনি তখন হাসপাতালে অন্যান্যদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন। পরিবারের মৃত্যুর খবরে তিনি দীর্ঘদিন কাজ থেকে বিরতি নেন। পরে মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে নতুন করে সংসার শুরু করে আবার কাজে ফেরেন।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে কমপক্ষে ১,৭০০ চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন এবং ৮৩ জন স্বাস্থ্যকর্মী ইসরায়েলি হেফাজতে রয়েছেন। পাবলিক লাইব্রেরি অব সায়েন্সে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৪১ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী পরিবারের সদস্য হারিয়েছেন এবং ৪৬ শতাংশ ব্যক্তিগত শোক ও কর্মস্থল থেকে বাস্তুচ্যুতির অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। ৭৮ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অ্যাক্সেস নেই।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বুরশ বলেন, চিকিৎসকরা পেশাগত দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত শোকের মধ্যে আটকে আছেন। তিনি জানান, চিকিৎসক ও নার্সদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং বিশ্রামের সময় দেওয়া জরুরি। কিন্তু হত্যা, আটক ও আহতের কারণে চিকিৎসক সংকট তীব্র, ফলে বাকিদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
খান ইউনিসের নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সের নার্স হিবা আল-তাওয়িল (৩৯) আইসিইউতে নিজের ভাইয়ের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেন। এই ঘটনা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং পরে তিনি অন্য বিভাগে বদলি হয়ে কিছুটা স্বস্তি পান। হাসপাতালের মনোবিজ্ঞানী রেহাম আবু রোকবা জানান, মানসিক চিকিৎসা শুরু হয় রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন ও উপসর্গ নির্ণয়ের মাধ্যমে। পিটিএসডি রোগীদের জন্য কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি ব্যবহার করা হয়, প্রয়োজনে ওষুধ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, নিয়মিত সেশন ও চিকিৎসা পরিকল্পনা মেনে চললে ধীরে ধীরে উন্নতি হয়।