
লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩২৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জয় পেয়েছে পাকিস্তান। এই জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান ফখর জামান, যিনি শতক হাঁকিয়ে দলকে জয়ের পথ দেখান।
ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম চার ম্যাচে ফখরের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। তিনি মাত্র ৩১ রান করেছিলেন এবং শর্ট বলে বারবার সমস্যায় পড়েছিলেন। ফাইনালের আগে তাই তাঁকে বাদ দেওয়ার আলোচনা উঠেছিল। কিন্তু বড় ম্যাচে তাঁর অতীত রেকর্ডই শেষ পর্যন্ত তাঁকে একাদশে জায়গা করে দেয়।
২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে তাঁর সেঞ্চুরি পাকিস্তান ক্রিকেটের অন্যতম স্মরণীয় ইনিংস। পরের বছর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালেও ৪৬ বলে ৯১ রান করে দলকে শিরোপা জিতিয়েছিলেন তিনি।
লাহোরের ফাইনালে শ্রীলঙ্কা আগে ব্যাট করে পাকিস্তানকে ৩২৬ রানের লক্ষ্য দেয়, যা ওয়ানডে ফাইনালের ইতিহাসে যৌথভাবে সর্বোচ্চ। রান তাড়ায় নেমে ২১ বলের মধ্যেই প্রথম তিন ব্যাটসম্যানের দুজনকে হারায় পাকিস্তান। বাবর আজম ফেরেন শূন্য রানে।
ফখরও প্রায় ফিরে যাচ্ছিলেন। আসিতা ফার্নান্দোর বলে তাঁর কাট শট ডিপ থার্ডে ক্যাচ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। দিলশান মাদুশঙ্কা ক্যাচ ধরতে গিয়ে ব্যর্থ হন। বল তাঁর হাতে লেগে সীমানার বাইরে চলে যায়। সেই জীবন পেয়েই যেন নতুন করে শুরু করেন ফখর।
তাঁর সঙ্গে যোগ দেন তরুণ সাদ বেগ। দুজনের জুটিতে আসে ১৪৯ রান। সাদ করেন ৭৪। ম্যাচ শেষে সাদকে কৃতিত্ব দিতে ভুল করেননি ফখর। বলেছেন, ‘সাদ যখন ব্যাট করতে আসে, তখন আমি কিছুটা স্ট্রাগল করছিলাম। ও খুব দ্রুত রান তুলেছে। তাতে আমি স্বস্তি পেয়েছি। ও যদি ধীরে খেলত, তাহলে হয়তো আমাকে ঝুঁকি নিতে হতো। উইকেটও হারাতে পারতাম। ও যেভাবে শুরু করেছে এবং ইনিংস গড়েছে, কৃতিত্ব ওরই।’
৩০০ বা এর বেশি রান তাড়া করে জেতা ওয়ানডেতে ফখরের গড় ৬০-এর বেশি। এমন ম্যাচে তাঁর চারটি সেঞ্চুরি রয়েছে, যা পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাবর আজম ও ইউনিস খানের রয়েছে তিনটি করে।
ফাইনালেও সেই রেকর্ডের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। ৭৪ রান করে সাদের বিদায়ের পর আসিতা ফার্নান্দোর প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকান। এরপর স্কয়ার লেগের ওপর দিয়ে পুল করে পূর্ণ করেন সেঞ্চুরি। মাইলফলক ছোঁয়ার পরও থামেননি। দিলশান মাদুশঙ্কার বলে আরেকটি ছক্কা মারেন।
ফখরের ভাষায়, ‘আমি যথেষ্ট ক্রিকেট খেলেছি। বুঝতে পারি, যখন আমার দিন থাকে এবং বল ব্যাটে ভালোভাবে আসে, তখন বড় শট খেলব। সেই দিনের অপেক্ষায় ছিলাম। বিশেষ কিছু করিনি। আগের ম্যাচগুলোর মতোই প্রস্তুতি নিয়েছি। আমি রান করলে সবাই বলে, মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম, ফিট ছিলাম। কিন্তু প্রস্তুতি একই ছিল। সৌভাগ্যক্রমে রান পেয়েছি। প্রথম চার ম্যাচ যেভাবে গেছে, তাতে বড় একটা ইনিংস আমার পাওনা ছিল। অনেক দিন ভালো ব্যাটিং করেও রান পাওয়া যায় না।’
২৭তম ওভারে সাদ বেগের বিদায় থেকে ৩৪তম ওভারে ফখরের আউট পর্যন্ত পাকিস্তান করেছে ৬২ রান। পুরো টুর্নামেন্টে এই সময়টুকুতে কোনো দল এত রান তুলতে পারেনি। এর মধ্যে একাই ৫৩ রান করেছেন ফখর।
তিনি যখন মাঠ ছাড়েন, গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের দর্শকেরা দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান তাঁকে। পাকিস্তানের জয়ের জন্য তখন ওভারপ্রতি ছয়ের একটু বেশি রান প্রয়োজন। নিজের কাজ প্রায় শেষ করে গিয়েছিলেন ফখর। পরের ব্যাটসম্যানদের জন্য জয়ের পথও অনেকটা সহজ করে দিয়েছিলেন।
ফখরের কাছে ফাইনালে রান করার আনন্দও আলাদা। তিনি বলেছেন, ‘আমার জন্য ভালো ব্যাপার হলো, ফাইনালে আমি রান করতে পারি। আপনি ট্রফি জেতার জন্য পারফর্ম করেন। ফাইনালে রান করতে পারলে তৃপ্তিটা বেশি।’
বয়স ৩৬। সাম্প্রতিক ফর্মও সব সময় তাঁর পক্ষে থাকে না। ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম চার ম্যাচে ব্যর্থতার পর ফাইনালে এমন ইনিংস খেলা তাই তাঁর সামর্থ্যেরই আরেকটি প্রমাণ। বড় ম্যাচে চাপ সামলে দলের জন্য দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা এখনো তাঁর বড় শক্তি।
ফখর হয়তো প্রতিটি ম্যাচে রান করবেন না। বয়স ও ফর্মের বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু বড় মঞ্চে তাঁর সামর্থ্য যে এখনো ফুরিয়ে যায়নি, লাহোরের ফাইনাল সেটিই দেখিয়েছে। পাকিস্তানের সামনে যখনই বড় বিপদ এসেছে, ফখর জামান বারবার হয়ে উঠেছেন ভরসা।