
বিংশ শতাব্দী মানব ইতিহাসের সবচেয়ে টালমাটাল সময়। দুই বিশ্বযুদ্ধ, ঠান্ডা যুদ্ধ, প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন আর বিশ্বায়নে মাত্র এক শতকেই মানুষের সভ্যতার চেহারা পাল্টে গেছে। তবে প্রযুক্তি ও প্রতিবেশ যত দ্রুত বদলেছে, মানুষের মনন ততটা বদলায়নি; ফলে নানা টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।
এই শতকের অন্যতম যুগসন্ধিক্ষণ ১৯৭১। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বছর। লাখো প্রাণ ও কোটি মানুষের বাস্তুহারা হওয়ার বিনিময়ে নতুন দেশ। বৈশ্বিকভাবে সে বছরই নিক্সন শক ঘটে—ডলারের বিপরীতে সোনার মজুতের বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ফিয়াট মানি ব্যবস্থা চালু করে। এতে বিশ্ববাণিজ্য, ঋণব্যবস্থা ও মুদ্রাস্ফীতির চেহারা চিরতরে পাল্টে যায়।
এই দুটি ঘটনার পাশাপাশি সে বছর দর্শনশাস্ত্রেও যুগান্তকারী ঝাঁকি লাগে। এক তরুণ অস্ট্রেলীয় দার্শনিক নীতিশাস্ত্র, ধনী-গরিবের সম্পর্ক ও দায়িত্ব এবং বিশেষত নীতিবোধ ও দানের সেক্যুলার ব্যাখ্যার নতুন ধারণা নিয়ে একটি ছোট কিন্তু ঝাঁজালো রচনা লেখেন।
জীবিত দার্শনিকদের মধ্যে তর্কযোগ্যভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী পিটার সিঙ্গারের ১৯৭২ সালে ‘ফিলোসফি অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স’ জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘ফ্যামিন, অ্যাফ্লুয়েন্স, অ্যান্ড মোরালিটি’ আধুনিক পাশ্চাত্য নীতিশাস্ত্রের গতিপথ বদলে দেয় এবং আজকের বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলা ‘কার্যকর পরার্থপরতা’ আন্দোলনের জন্ম দেয়।
তরুণ সিঙ্গার সেই প্রবন্ধটি লিখেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকে কেন্দ্রে রেখে। রচনার শুরুতেই তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের নভেম্বরে যখন আমি লিখছি তখন খাবার, আশ্রয় ও চিকিৎসার অভাবে পূর্ববাংলায় মানুষ মরছে। এই মৃত্যু ও ভোগান্তি অবধারিত নয় এবং কোনো বিচারেই একে অপ্রতিরোধযোগ্য বলা যায় না। মানুষের সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ এসব মর্মান্তিক ভোগান্তির অবসান ঘটাতে পারে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে মানুষ সেই সঠিক সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ নিতে পারছে না। আমাদের অসীম লোভ ও দায়িত্বহীনতা দিনকে দিন অবস্থা খারাপ করছে। ধনী দেশগুলোকে ধিক্কার দিয়ে সিঙ্গার বলেন, আমাদের চোখের সামনে একটি শিশু ডুবে মারা যাচ্ছে, অথচ কাপড় নোংরা হবে বলে আমরা পানিতে ঝাঁপ দিয়ে তাকে বাঁচাচ্ছি না।
সিঙ্গারের প্রবন্ধটি ছিল আবেগ ও বাস্তবতার মিশেল। তিনি উপাত্ত দিয়ে দেখান, ১৯৭১ সালের নভেম্বরে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে শিবিরে থাকা ৯০ লাখ বাঙালি শরণার্থীকে এক বছর বাঁচিয়ে রাখার প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৪৬ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ড, অথচ সব আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সংগৃহীত মোট সহায়তা ছিল ৬ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড—প্রয়োজনের সাত ভাগের এক ভাগেরও কম। অথচ ব্রিটিশ সরকার কনকর্ড সুপারসনিক বিমান প্রকল্পে ব্যয় করেছিল ৪৪ কোটি পাউন্ড।
সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পণ্ডিতমশাই’–এর মতো সিঙ্গারও হিসাব কষে দেখান, ৯০ লাখ শরণার্থীর চেয়ে একটি সুপারসনিক বিমানের মূল্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে ৩০ গুণ বেশি ছিল। পূর্ববাংলার মানুষের সেই মৃত্যু কোনো অনিবার্য প্রাকৃতিক নিয়তি ছিল না; তা ছিল ধনী দেশ ও সচ্ছল নাগরিকদের ভুল অগ্রাধিকার এবং নৈতিক নিষ্ক্রিয়তার সরাসরি ফল।
সিঙ্গারের দর্শন মূলত তিনটি সিদ্ধান্তের ওপর দাঁড়ানো। প্রথমত, খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসার অভাবে মানুষের যন্ত্রণাভোগ ও মৃত্যু নৈতিকভাবে খারাপ—এ ব্যাপারে কোনো যদি-কিন্তু নেই। দ্বিতীয়ত, জীবনের মতো চূড়ান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিসর্জন না দিয়ে যদি এমন খারাপ ঘটনা রোধ করার ক্ষমতা কারও থাকে, তবে তা রোধ করা মহত্ত্ব নয়, বরং নৈতিক কর্তব্য। সামর্থ্য থাকতেও অসহায় মানুষকে দান বা সাহায্য না করা তিরস্কারের যোগ্য। দান করাকে প্রশংসনীয় ভাবলেও দান না করাকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়ার মানসিকতা বদলাতে হবে।
তৃতীয়ত, ভৌগোলিক দূরত্ব বা নৈকট্য এই নৈতিক বাধ্যবাধকতা বিন্দুমাত্র কমায় না। সুদূর আফ্রিকা বা এশিয়ার কোনো দেশে একটি শিশুর দারিদ্র্যজনিত মৃত্যু হলে সেই দায়বদ্ধতা ইউরোপ বা আমেরিকার একজন ধনী মানুষের ওপরও বর্তায়।
সিঙ্গারের এই ধারণা সেক্যুলার ও বস্তুবাদী নীতির ওপর দাঁড়ালেও ধর্মীয় দর্শনের দানের ধারণার সঙ্গে কিছু জায়গায় মিলে যায়। উল্লিখিত প্রবন্ধে তিনি টমাস একুইনাস ও অ্যামব্রোসের প্রাকৃতিক আইনের উদ্ধৃতি টেনে মনে করিয়ে দেন, মানুষের প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রাচুর্য প্রাকৃতিক অধিকার হিসেবে দরিদ্রদের প্রাপ্য। ‘তুমি যে রুটি আটকে রাখো তা ক্ষুধার্তের প্রাপ্য, যে পোশাক আলমারিতে বন্ধ করে রাখো তা বস্ত্রহীনের প্রাপ্য, এবং যে অর্থ মাটিতে পুঁতে রাখো তা নিঃস্ব মানুষের মুক্তি।’
খ্রিষ্টীয় তাত্ত্বিকদের উল্লেখ করলেও সিঙ্গারের দর্শনের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের জাকাত প্রথার বেশি মিল পাওয়া যায়। জাকাত ইসলামে ঐচ্ছিক নয়, বরং পাঁচটি মূল ভিত্তির একটি। কোন সম্পদের ওপর কোন হারে জাকাত আদায় করতে হবে তাও সুস্পষ্ট। জাকাত আদায় না করা গুরুতর গুনাহ। তবে সিঙ্গারের নীতিতে দাতাকে জোর করার উপায় নেই; বরং তার নৈতিকতাকে জাগ্রত করে যত দূর সম্ভব দান করানোটাই উদ্দেশ্য।
বস্তুবাদী ও ধর্মীয় দর্শনের সংশ্লেষে নীতিবোধের চর্চার পাশাপাশি সিঙ্গারের দর্শন পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সম্পদের উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধিকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবার মানসিকতাকেও প্রশ্ন করে। তাঁর ‘প্রেফারেন্স ইউটিলিটারিয়ানিজম’ তথা স্বার্থ-অগ্রাধিকারভিত্তিক উপযোগবাদ জোর দেয় সেই সম্পদ মানুষের জীবনকে কতটা উন্নত করছে, কাদের কষ্ট কমাচ্ছে এবং কাদের স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে। এই দর্শনে কোনো কাজের নৈতিক মান নির্ধারিত হয় তার চূড়ান্ত ফলাফলের নিরিখে।
সিঙ্গারের ‘স্বার্থের সম-বিবেচনা নীতি’ মনে করে বর্ণ, লিঙ্গ ও জাতীয়তাভেদে যন্ত্রণা একটি বৈশ্বিক ব্যাপার। এ কারণে নৈতিক মর্যাদাবোধ ভাষা বা বুদ্ধিমত্তা নয়, বরং নির্ভর করে সংবেদনশীলতার ওপর। এই সংবেদনশীলতা কেবল মনুষ্য প্রজাতিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দুনিয়ার সব প্রাণীর জন্য প্রযোজ্য। সিঙ্গারের দর্শনের হৃদয় হচ্ছে সংবেদনশীলতা।
‘কাউকে মাছ দিলে তার এক বেলা খাবার জুটবে, কিন্তু তাকে মাছ ধরা শিখিয়ে দিলে সে আজীবনের জন্য ক্ষুধা থেকে মুক্তির উপায় পাবে’—চীনা প্রবাদের এই কথাটিই সিঙ্গার বলেছেন আধুনিক বাস্তবতার উপযোগী তথ্য-প্রমাণ দিয়ে। এই ধারণাকে তাত্ত্বিক কাঠামো দিয়েছেন, বাস্তব প্রয়োগেও রাখছেন অগ্রণী ভূমিকা। এসব নীতির ওপর ভিত্তি করে ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বই ‘দ্য লাইফ ইউ ক্যান সেভ’, এবং ২০১৫ সালে ‘দ্য মোস্ট গুড ইউ ক্যান ডু’।
মার্ক্স যেমন বলতেন দার্শনিকের কাজ কেবল দুনিয়াকে বিশ্লেষণ নয়, বরং এর পরিবর্তন করা—সিঙ্গারও সেই পথেই হেঁটেছেন। চার্লি ব্রেসলারের সঙ্গে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত তাঁর অলাভজনক সংস্থা ‘দ্য লাইফ ইউ ক্যান সেভ’ গত এক দশকেরও বেশি সময়ে ২২টি পরীক্ষিত উচ্চ প্রভাবশালী সংস্থার জন্য ১২ কোটি ডলারেরও বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছে। সংস্থার নিজস্ব পরিচালনায় ব্যয় হওয়া প্রতি এক ডলারের বিপরীতে সুপারিশকৃত দাতব্য সংস্থাগুলোর জন্য আনুমানিক ৯ দশমিক ১৯ ডলার অনুদান সৃষ্টি হয়েছে।
১৯৭১ সালের তরুণ সিঙ্গার আজ জ্ঞানবৃদ্ধ; পৃথিবীর অবস্থা কোনো কোনো দিক দিয়ে আগের চেয়ে অনেক খারাপ হয়েছে, তবে তাঁর দার্শনিক লড়াই চলছে। যে অসহায় বাংলাদেশকে নিয়ে সিঙ্গার ক্ষোভে, অসহায়ত্বে আবেগঘন অথচ বাস্তব লড়াইয়ের দিশা দিয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশ তাঁর শত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে উন্নয়নের মডেল হয়েছে বিগত পাঁচ শতকে। সিঙ্গারের যাত্রা আর বাংলাদেশ একসঙ্গে পথ পেরিয়েছে।
সিঙ্গারের চিন্তা ও কাজের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশসহ গোটা দুনিয়ার উন্নয়ন ভাবনায়। কেবল দান-খয়রাতের মাধ্যমে সামাজিক পিরামিডের পাটাতনে থাকা মানুষের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব—তা এখন প্রায় সর্বজনস্বীকৃত। এমনকি শুধু ঋণ দিয়েও নয়। সিঙ্গার নিছক দান-খয়রাত না করে বিপন্ন মানুষের মধ্যে বিপদ কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা তৈরির জন্য কাজ করার কথা বলেছেন।
বিশ্বের শীর্ষ এনজিও ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো ক্রমেই সেদিকে হাঁটতে শুরু করেছে। অতিদারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে থাকা মানুষদের কাছে উৎপাদনশীল সম্পদ হস্তান্তর, ঋণ-বিমার মতো সেবা পৌঁছানো এবং তাদের কৌশলগত ও মানসিক সহায়তা বা প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে নিজের ওপর ভর করেই নিজের ভাগ্যোন্নয়নের মডেল আজ সারা বিশ্বে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
পিটার সিঙ্গার ব্যক্তিগত দানের ওপর গুরুত্ব দেন, কিন্তু সেই দান সঠিক চ্যানেলে না গেলে যে খুব বেশি লাভ হয় না এবং সবচেয়ে বেশি যাদের দরকার তাদের কাছে পৌঁছে না—এই ব্যাপারেও তিনি সতর্ক করেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমাদের মতো গরিব দেশেও প্রতিবছর প...