
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি নজরুল ইসলামের মরদেহ একবার দেখতে চান তাঁর বাবা-মা। গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) ছেলের মৃত্যুদণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকে শোকে বিধ্বস্ত পরিবারটি এখন শুধু মরদেহ দেশে ফেরানোর অপেক্ষায়।
নজরুল ইসলাম (২৫) ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বাসিন্দা। সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। একই ঘটনায় সুইটি আখতার নামের আরেক বাংলাদেশি নাগরিকেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নজরুলের বাবা আবদুল বাছির দীর্ঘ ২৪ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। ২০২০ সালে দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন। সচ্ছলতার আশায় ছয় লাখ টাকা ঋণ করে ২০২২ সালের নভেম্বরে বড় ছেলে নজরুলকে সৌদি আরবে পাঠান। সেখানে তিনি মক্কার হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ শুরু করেন। তবে যাওয়ার আট মাসের মাথায় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং এরপর তিন বছর তিনি কারাগারে ছিলেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গ্রেপ্তারের এক মাস পর তারা বিষয়টি জানতে পারেন। মাঝেমধ্যে নজরুল বাবা-মায়ের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেন। সর্বশেষ গত ১১ অক্টোবর দুই থেকে আড়াই মিনিট কথা হয়। এরপর গত বুধবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সৌদি আরব থেকে এক ব্যক্তি ফোন করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর দেন।
খবর শুনে নজরুলের ফুফু আবেদা বেগম (৬৫) মূর্ছা যান এবং ওই রাত দুইটার দিকে মারা যান। এদিকে ছেলের মৃত্যুদণ্ডের খবরে শোকে কাতর মা রহিমা বেগম বলেন, ‘ছেলেই এক মাস পরপর ফোন করত। এক থেকে দুই মিনিট কথা বলত। আমার ছেলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হইছে তা মিথ্যা। আমি শেষবারের মতো ছেলের লাশ দেখতে চাই।’
আবদুল বাছির বলেন, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠান। প্রথম সাত-আট মাসে ছেলে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। এরপর তিন বছর ধরে ছেলে সৌদি আরবের জেলে ছিল। এখনো ঋণের সাড়ে চার লাখ টাকা বাকি। ছেলের মরদেহ একবার দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
নজরুলের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন। তাঁরা জানান, নজরুল বিনয়ী ও ভদ্র ছিলেন; এমন অভিযোগ তাঁর চরিত্রের সঙ্গে যায় না। নজরুলের দূরসম্পর্কের দুই চাচাতো ভাই মোস্তাকিম ভূঁইয়া ও ইমাম হাসান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, সৌদি আরবে পরিচ্ছন্নতার কাজ করার সময় নজরুলের সঙ্গে এক পাকিস্তানি নাগরিকের বিরোধ তৈরি হয়। ওই ব্যক্তির ষড়যন্ত্রের কারণেই নজরুলের এমন পরিণতি হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।
নজরুলের বন্ধু রাহাত ভূঁইয়া বলেন, সৌদি আরবে নজরুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সে এ ধরনের কাজ করেছে বলে বিশ্বাস হচ্ছে না। স্থানীয় দাখিল মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা নাঈমুর রহমান বলেন, নজরুলের আচার-আচরণ ও চলাফেরা খুবই ভালো ছিল। দেশে থাকতে তাঁর চলাফেরায় কখনো এমন কিছু দেখিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বিষয়টি জানতে পেরেছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা প্রশাসন কাজ করবে।