
মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে উপস্থিতির ঘটনায় সমালোচনার মুখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ইশরাক হোসেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি এই পদত্যাগ করেন বলে জানিয়েছেন। সোমবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেন এবং ওই ঘটনার সাফাই দেন।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেন, 'আজকের দিন থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে।' প্রধানমন্ত্রী তার পদত্যাগে সম্মতি দিয়েছেন বলেও তিনি জানান। উল্লেখ্য, গত রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে ডেকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করতে বলেন। এর আগে গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ইশরাকের উপস্থিতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন ঘটনার দীর্ঘ বর্ণনা দেন এবং নিজের অবস্থান সঠিক বলে দাবি করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো আগের স্বাভাবিক কার্যক্রমে পুরোপুরি ফিরতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে ছয়-সাত মাস পর তাঁরা নিজেরাই কিছু উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছেন। ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে বিভিন্ন বাহিনীর কাছে বারবার ধরনা দিলেও প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে জানান তিনি।
ইশরাক হোসেন আরও বলেন, তিনি যে নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য, সেখানে ঢাকার সূত্রাপুর, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া এবং বংশাল ও কোতোয়ালি থানার আংশিক এলাকা নিয়ে ১১টি ওয়ার্ড রয়েছে। এসব এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, যানজটসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ ও ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ও ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈঠক করেন তাঁরা।
তিনি বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে এলাকার ছোটখাটো সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব তাঁদের দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিটি গলিতে গিয়ে নির্দেশনা দিতে হবে—এমন নয়। 'উনি ক্যাবিনেটের প্রধান। উনি নির্দেশই দেবেন।' প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে নিজের বক্তব্য ও চাহিদা তুলে ধরেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁর নির্বাচনী এলাকার তিনটি থানা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল উল্লেখ করে ইশরাক বলেন, তখন থানাগুলোতে কার্যত কিছুই ছিল না। তাঁরা পুলিশের বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন এবং আসবাবের ব্যবস্থা করেছেন। তিনি বলেন, তাঁরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করেন এবং দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছেন। বিরোধী দলে থাকাকালেও তাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন, এখন সেই ভূমিকা আরও জোরালোভাবে পালন করতে চান।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা নিয়ে প্রকাশিত খবরের সময় ও প্রক্রিয়া নিয়ে 'বিভ্রান্তি' সৃষ্টি হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন ইশরাক হোসেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসার কথা ছিল নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। কিন্তু তাঁর কোনো সহকর্মী নির্ধারিত সময়ের আগেই বিষয়টি প্রকাশ করে দেওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
ইশরাক হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টিকে গুজব বা অসত্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সোমবার সকালে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত তাঁর কাছে এসেছে। তিনি বলেন, 'গতকাল হইছে, না আজকে হইছে, তাতে কি আসে যায়? হইছে।'
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক ইশরাক হোসেনের কাছে জানতে চান, তিনি কি এখন মেয়র পদে নির্বাচনের কথা ভাবছেন? জবাবে ইশরাক বলেন, 'মেয়র নির্বাচনের বিষয়ে বলেছি, এটি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং আমাদের আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের ওনার এখতিয়ারভুক্ত এবং ওনার একক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবে। আমি যেটা বলেছি, যে ইতিপূর্বে ২০২০ সালে এই নির্বাচনটি আমি করেছি। নির্বাচনের অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে শুধু নয়, নগরীর বিভিন্ন সমস্যাগুলো নিয়ে আমি দীর্ঘদিন যাবৎ কাজ করে আসছি দলের নির্দেশনা অনুযায়ী।'
ইশরাক বলেন, ঢাকার সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অভাব, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং কাঠামোগত নানা দুর্বলতা। এসব বিষয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন। দল তাঁকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত দিলে তিনি শতভাগ প্রস্তুত। তবে দল অন্য কাউকে প্রার্থী করলেও সেই প্রার্থীকে বিজয়ী করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন তিনি।
পদত্যাগের ঘটনায় কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইশরাক হোসেন বলেন, 'না, রাজনৈতিক দল থেকে ষড়যন্ত্রের শিকার হইনি। তবে আমি আমাদের আজকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতার মুখ থেকে একটা উক্তি শুনে ব্যথিত হয়েছি। মানে উনি বলেছেন, আমি সন্ত্রাস করছি অস্ত্র উঁচিয়ে। এটার আমি আর কীভাবে ব্যাখ্যা দেব যে দিনেদুপুরে আমি কী কাজে গিয়েছি, এখানে থানা–পুলিশ ছিল, এত শত শত মানুষ ছিল। এখানে ৩০০ গ্রাম হেরোইন, কয়েক বোতল মদ, আরও অন্যান্য অনেক কিছু অবৈধ জিনিসপত্র উদ্ধার হয়েছে।'
ইশরাক হোসেন বলেন, 'আমি তো জীবন বাজি রেখে গিয়েছি, এটা অনেকে বলে আমাকে যদিও আমি কেয়ার করি না। কারণ, ছাদের ওপর থেকে গুলি করলে কার মাথায় পড়বে—উই ডোন্ট নো। তার পরেও যখন ওনাদের মুখ থেকে সহযোগিতার আশ্বাসের বদলে এই ধরনের এক অ্যালিগেশন (অভিযোগ) শুনি, তখন আমার কাছে মনে হয় যে আসলে আর তাকাব না ওই দিকে।'
সংসদ সদস্য ইশরাক বলেন, 'আমি সাধারণ মানুষের যে চাহিদা...আমি দেখেছি যে ওই দিন—সাধারণ মানুষ, এলাকাবাসী তারা হাততালি দিয়ে রীতিমতো উল্লাস করেছে। অনেক দিন পর আমরা সাহস পেয়েছি, তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী আমি কাজ করে যাব।'
ইশরাক হোসেন সাধারণ মানুষের হাততালি পাওয়ার বিষয়টিকে জোরালোভাবে তুলে ধরলেও তাঁর এই কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। তাঁর কর্মকাণ্ড ক্ষমতার প্রদর্শন, অপরিপক্বতা, হামবড়া ভাবের একটা জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ইশরাকের পরিণতিবোধের অভাবের কারণে সরকারের বদনাম হয়েছে বলে মনে করছেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
সংবাদ সম্মেলন শেষ করে নেতা–কর্মীবেষ্টিত হয়ে প্রেসক্লাব ভবনের তিনতলা থেকে নেমে আসেন ইশরাক হোসেন। এ সময় নেতা–কর্মীরা তাঁকে ঘিরে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। পরে গাড়িতে চড়ে নেতা–কর্মীদের উদ্দেশে হাত নাড়ান ইশরাক। গাড়ির ছাদ খুলে হ্যান্ডমাইকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যও দেন তিনি। সেখানেও নিজের পদত্যাগের কথা আবারও জানান তিনি।