
রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর রেলগেট এলাকায় শনিবার বিকেলে মাদকবিরোধী অভিযান চালান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এ সময় তিনি হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে চিৎকার করে বলেন, ‘এই ধর ধর ধর...।’ তাঁর পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরা তখন কয়েকজনকে ধরতে দৌড়ান এবং একজনকে লাথি দেন।
প্রতিমন্ত্রীর ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, তাঁর হাতে থাকা পিস্তলটি কিছু অংশে অস্পষ্ট করা হলেও অন্য অংশে স্পষ্ট। তাঁর সঙ্গে থাকা আরও দুই ব্যক্তির হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। ভিডিওটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, ‘ইশরাকের অ্যাকশন: মাদক আস্তানা গুঁড়িয়ে বিক্রেতাদের পুলিশে সোপর্দ’। ভিডিওতে তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ এবং স্থান গেন্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন এলাকা।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক পাভেল শিকদার প্রথম আলোকে বলেন, বেলা তিনটা থেকে সাড়ে তিনটার দিকে তাঁরা সেখানে যান। স্থানীয় লোকজনের বারবার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী সেখানে গিয়েছিলেন এবং পুলিশকেও জানানো হয়েছিল। তবে পুলিশ পৌঁছাতে দেরি করে।
ভিডিওতে দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রী অস্ত্র হাতে গাড়ি থেকে নামার পর তাঁর সঙ্গীরা রেললাইনের পাশে অবস্থান করা কয়েকজনকে ধরতে এগিয়ে যান। এ সময় কয়েক যুবক বলতে শোনা যায়, ‘স্যার আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ স্যার।’ প্রতিমন্ত্রী তখন বলেন, ‘পুলিশ আসবে তারপর কথা হবে।’ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর নিয়োগ দেওয়া দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলু এবং একজন সরকারি দেহরক্ষী ছিলেন। নিজের নিয়োগ দেওয়া দেহরক্ষীদের কাছেও অস্ত্র ছিল। সরকারি দেহরক্ষীকে অস্ত্র তাক করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে একজন দেহরক্ষী এক তরুণকে লাথি দেন। লাথি দেওয়া ব্যক্তি কে, জানতে চাইলে পাভেল শিকদার বলেন, তিনি প্রতিমন্ত্রীর সরকারি দেহরক্ষী, তবে তাঁর নাম জানাতে পারেননি।
ভিডিওতে গুলি করার হুমকি দেওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সেখানে গুলি ছোড়া হয়নি বলে দাবি করেছেন পাভেল শিকদার।
এ ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে—প্রতিমন্ত্রীর হাতে থাকা অস্ত্রটি বৈধ কি না; বৈধ হলেও একজন প্রতিমন্ত্রী কি এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কি না; মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের যদি এভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হয় তাহলে পুলিশের কাজ কী; এবং সিস্টেম বা ব্যবস্থা ঠিক না করে এভাবে একজন প্রতিমন্ত্রীর অভিযান গ্রহণযোগ্য কি না।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর হাতে থাকা অস্ত্রটি বৈধ। তিনি ঢাকা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দেওয়া তাঁর হলফনামায় আগ্নেয়াস্ত্র থাকার কথা উল্লেখ করা হয়নি। প্রতিমন্ত্রী ইশরাক বলেন, তিনি অস্ত্রটি নিয়েছেন ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান হাদীকে গুলি করার পর। যখন তিনি এটি নিয়েছেন, তখন মনোনয়নপত্রে দেখানোর সুযোগ ছিল না। মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন ছিল ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর এবং প্রতিমন্ত্রী ইশরাক মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ২৮ ডিসেম্বর।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহারের শর্ত দেওয়া হয়েছে। অনুচ্ছেদের ‘ক’ উপ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি স্বীয় লাইসেন্সে অন্তর্ভুক্ত অস্ত্র আত্মরক্ষার নিমিত্ত নিজে বহন/ব্যবহার করতে পারবেন। তবে অন্যের ভীতি/বিরক্তি উদ্রেক করতে পারে এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।’
বিষয়টি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তিনি একজন জনপ্রতিনিধি এবং তাঁর সংসদীয় আসনের মধ্যে গেন্ডারিয়ার রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর এলাকাটি পড়েছে। সেখানে মাদক ব্যবসা হয়। এলাকার মানুষ বারবার তাঁর কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। তিনি পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছেন, তবে কাজ হয়নি। এ কারণে বাধ্য হয়ে তিনি সেখানে গেছেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, পুলিশ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তিনি অন্ততপক্ষে ৩০-৪০ বার পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা একেক সময় একেক কথা বলে। তাদের জনবল কম, গাড়ি নেই—এসব কথা বলে। এর আগে সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে কয়েকজন পুলিশ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। মাদক ব্যবসায়ীরা দূর থেকে গুলি করে দেয়। সে কারণে তাঁর হাতে অস্ত্র ছিল। তিনি বলেন, ‘আমি তো আর গুলি করি নাই, ওটা নিয়ে কাউকে ভয়ও দেখাই নাই। হ্যাঁ, অভিযান আমরা করেছি, আমরা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলছি।’ অবশ্য ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রী অস্ত্র তাক করে আছেন এবং ঘটনাস্থলে শিশুরাও রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনার পরও পুলিশ কেন ব্যবস্থা নেয় না, জানতে চাইলে গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, ১১ অক্টোবর তাঁরা ৩০০ পুলিশ নিয়ে অভিযান চালিয়েছেন। অভিযানে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সদস্যরা ছিলেন। প্রতিমন্ত্রীর অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ হয় এবং তাঁরা অভিযান ও ফলাফলের বিষয়ে সব সময় জানান।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাককে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঠেকানোসহ বিভিন্ন অভিযানে গিয়ে ফেসবুকে ভিডিও দিতে দেখা যায়। তাঁর পেজের অনুসারী সংখ্যা ৪০ লাখ। তবে শনিবারের মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিওটি তাঁর পেজ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, সরকার ও মন্ত্রীদের কাজ হলো নির্দেশ দেওয়া, পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। মন্ত্রীকেই যদি অস্ত্র হাতে অভিযানে নামতে হয়, তাহলে পুলিশের কাজ কী? তিনি বলেন, একজন প্রতিমন্ত্রী যেভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন, তা বেআইনি।