
দক্ষিণ কোরিয়ার গুর্যে কাউন্টিতে অনুষ্ঠিত পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান প্রতিযোগিতা শেষ করেছেন বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে। ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার সাঁতার, ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং ও ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার দৌড় মিলিয়ে মোট ২২৬ কিলোমিটার দূরত্ব তিনি ১৫ ঘণ্টা ১৬ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে সম্পন্ন করেন। এই কৃতিত্বের মাধ্যমে তিনি ট্রায়াথলন অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যানের তালিকায় নাম লেখান। এর আগে গত ১২ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের নিসে ৭০.৩ আয়রনম্যান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ শেষ করা প্রথম বাংলাদেশি নারীও তিনি।
নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি জানান, পরপর দুটি আয়রনম্যান প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শরীর ও মনের জন্য বড় পরীক্ষা ছিল। দুটি প্রতিযোগিতাই তাকে নতুন করে শিখিয়েছে, শরীর যখন থেমে যেতে চায়, তখন মনোবলই আরও এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। ‘প্রথম’ শব্দটি তার কাছে শুধু রেকর্ড নয়, বরং একটি দায়িত্বও।
প্রথম পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যানের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় সাইক্লিংয়ের ৪০ থেকে ১০০ কিলোমিটার অংশ ছিল এবড়োখেবড়ো। কোথাও চড়াই, কোথাও উতরাই, আবার কোথাও পথ ছিল সংকীর্ণ। প্রায় ৪০ কিলোমিটার সাইক্লিংয়ের পর এমনই একটি এবড়োখেবড়ো পথে সামনের চাকা পিছলে যায় এবং তিনি পড়ে যান। এতে তার বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল ভেঙে যায়, হাঁটু ও হাত থেকে রক্তক্ষরণ হয় এবং মাথায়ও আঘাত লাগে।
আহত অবস্থায় এক স্বেচ্ছাসেবক কাঁদছিলেন এবং তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি রাজি হননি। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে তিনি ওই স্বেচ্ছাসেবককে বলেন, ‘যা-ই হোক, চেষ্টা থামাব না।’ সেই মনোবলই তাকে শেষ পর্যন্ত ফিনিশ লাইনে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।
সাঁতার, সাইক্লিং ও দৌড়ের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে কঠিন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনটি পর্বই কঠিন। তবে প্রতিযোগিতার স্থান ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে চ্যালেঞ্জের ধরন বদলে যায়। ফ্রান্সের নিসে সাঁতার কাটতে হয়েছে ভূমধ্যসাগরের উত্তাল পানিতে। এরপর সাইক্লিংয়ের পথে ছিল প্রায় ৪ হাজার ৯০ ফুট উচ্চতার চড়াই। বিশেষ করে প্রথম ৩৬ কিলোমিটারের খাড়া পাহাড় ও একের পর এক বিপজ্জনক বাঁক সামলানো খুব কঠিন ছিল। দেশের পাহাড়ি এলাকায় সাইক্লিং করলেও ওই ধরনের পথে চালানোর অভিজ্ঞতা তার ছিল না।
দক্ষিণ কোরিয়ার বরফশীতল পানিতে ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার সাঁতার কাটাও ছিল বড় পরীক্ষা। এরপর ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং শেষ করে যখন ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার দৌড় শুরু করেন, তখন শরীর অনেকটাই ক্লান্ত ছিল। সেই অবস্থায় পুরো ম্যারাথন শেষ করাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। তিনি বলেন, এসব প্রতিযোগিতায় শুধু শারীরিকভাবে ফিট থাকলেই চলে না; অপরিচিত পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, পরিস্থিতি বুঝে নিজের গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়াও সমান জরুরি।
ট্রায়াথলনে তার যাত্রা শুরু সম্পর্কে তিনি জানান, অফিসে পুরুষ সহকর্মীদের ফুটবল ও ক্রিকেট দলের সংগঠক এবং ম্যানেজার ছিলেন। জুনিয়র সহকর্মীরা তাকে ভরসা করত। মাঠে তাদের উৎসাহ দিতেন, তাদের সাফল্যে আনন্দ ভাগ করে নিতেন। অন্যদিকে, অফিসের সহকর্মী ফারুক প্রায়ই তার দৌড়ের অভিজ্ঞতার কথা বলতেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে একদিন তার দৌড় দেখতে গেলে সেখান থেকেই খেলাধুলায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ধীরে ধীরে সাঁতার ও সাইক্লিংয়ের অনুশীলন শুরু করেন। অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে ২০২৬ সালের জাতীয় সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সপ্তম স্থান অর্জন করেন। এভাবেই ট্রায়াথলনের পথে আসা। গত ১৭ মে চীনের সাংহাইয়ের চংমিং দ্বীপে আয়রনম্যান ৭০.৩ শেষ করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
চাকরি, সংসার ও অনুশীলনের ভারসাম্য কীভাবে রাখেন—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, তিনি আইসিবির জ্যেষ্ঠ প্রিন্সিপাল অফিসার। মা-বাবা ও স্বামীর সহযোগিতার কারণেই চাকরি বা সংসার ছেড়ে নয়, বরং সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় করে অ্যাথলেট হতে পেরেছেন। শুরুর দিকে সবকিছু সামলানো অনেক কঠিন ছিল। প্রশিক্ষণ, বাচ্চাদের স্কুল ও অফিস—সবকিছু সমন্বয় করতে হতো। খুব ভোরে উঠে সকাল ছয়টা থেকে আটটা পর্যন্ত অনুশীলন করতেন। এরপর বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে সোজা অফিসে চলে যেতেন। অফিস শেষে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে বাসায় ফিরতেন। রাত ১১টায় ঘুমাতে যাওয়ার আগে আরও দুই ঘণ্টা সময় বের করে ইনডোর ট্রেনিং করতেন।
মাঝেমধ্যে বাচ্চারাও তার সঙ্গে ইনডোর ট্রেনিং করত। খেলার ছলেই অনুশীলন করতেন। কখনো গান ছেড়ে দুই বাচ্চাকে নিয়ে আনন্দ করতে করতেই ট্রেনিং করতেন। ছুটির দিনে অনুশীলনের জন্য বেশি সময় রাখতেন।
তিনি ৪০-৪৪ বছর বয়স শ্রেণিতে প্রতিযোগিতা করেন। বয়সকে কখনো বাধা বলে মনে হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বয়স বাধা নয়। অনেক নারী ভাবেন, ত্রিশ বা চল্লিশের পর তাদের সময় শেষ হয়ে গেছে। তার গল্প সেই ধারণার বিপরীত। তিনি দেখাতে চান, ৩০-৪০ কিংবা তার পরেও নতুন করে শুরু করার সুযোগ থাকে। এই বয়সে পরিকল্পনা, ধৈর্য ও নিজের প্রতি শৃঙ্খলা অনেক বেশি থাকে, যা আয়রনম্যানের মতো দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় বড় সুবিধা দেয়। তবে শরীরের যত্ন ও বিশ্রামের দিকে একটু বেশি মনোযোগ দিতে হয়। বয়সকে বাধা না ভেবে নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
পরবর্তী লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি জানান, প্রথম লক্ষ্য হলো আয়রনম্যান প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য যে ঋণ করেছেন, সেগুলো পরিশোধ করা। পাশাপাশি নিজেকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান, যাতে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনতে পারেন। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের একজন স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাট হতে চান। পাশাপাশি দেশের মেয়েদের মধ্যে সুস্থ জীবনযাপনের সচেতনতা তৈরি করতে চান, যাতে তারা নিজেদের শরীর ও মনের সক্ষমতা বুঝতে পারে।