
আল-আবওয়া একটি গ্রাম, যা মদিনা থেকে ২৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে মক্কা-মদিনা সড়কের ডান দিকে জাবালু আরাতের পাশে অবস্থিত। স্থানীয় আবওয়া পাহাড় থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে। প্রাচীন যুগে 'তারিকুল কাওয়াফিল' বা 'তারিকুল হুজ্জাজ' নামে বিখ্যাত কাফিলার পথ এই গ্রামকে ছুঁয়ে গেছে। রাবিগ থেকে এর দূরত্ব ৪৩ কিলোমিটার এবং আল-জুহফা থেকে ২৩ মাইল।
হিজাজের তিহামা অঞ্চলে অবস্থিত এই স্থানটি পর্যাপ্ত পানি ও গাছপালার জন্য পরিচিত। এখানে ওয়াদি আল-ফারা ও ওয়াদি আল-ক্বাহা মিলিত হয়ে ওয়াদি আবওয়া নামে নতুন উপত্যকা তৈরি করেছে, যা বর্তমানে ওয়াদি আল-খারিবাহ নামে পরিচিত। স্থানটিতে নবীজির মায়ের কবর থাকায় এটি বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। এ ছাড়া ইসলামের প্রথম যুদ্ধ গাজওয়া আবওয়া এখানেই অনুষ্ঠিত হয়। এই যুদ্ধটি গাজওয়া ওয়াদ্দান নামেও পরিচিত। আবওয়া থেকে ওয়াদ্দানের দূরত্ব ছয় মাইল।
মুহাম্মদ (সা.) তাঁর মায়ের সঙ্গে ইয়াসরিব থেকে মক্কার উদ্দেশে পথ চলছিলেন। কিন্তু আবওয়ায় পৌঁছে মা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন। উম্মে আইমান শিশু মুহাম্মদকে নিয়ে মক্কায় আসেন। নবীজির জীবনে সেই স্মৃতি ছিল অমলিন। তিনি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করার সময় সম্ভবত দ্বিতীয়বার এ পথ মাড়িয়েছেন। এরপর বহুবার তিনি এ পথে চলেছেন এবং মায়ের কবর জিয়ারত করতে আসেন।
একবার তিনি বললেন, 'আমি মায়ের অনুকূলে ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চেয়েছিলাম; আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমি আমার প্রভুর নিকট তাঁর কবর জিয়ারতের অনুমতি চেয়েছিলাম; আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তোমরা কবরগুলো জিয়ারত করো, কারণ তা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়।' সাহাবিরা নবীজির এমন দৃশ্য আর কখনো দেখেননি—তিনি কাঁদলেন এবং কাঁদানোর মতো এক ঘণ্টা ধরে কাঁদলেন। পরে সবাইকে কবর জিয়ারতের অনুমতি দিলেন।
সোলাইমান ইবনে বুরাইদাহ তাঁর পিতাকে উদ্ধৃত করে বলেন, 'নবীজি একটি কবরের প্রান্তসীমায় গিয়ে থামলেন এবং বসলেন। মানুষেরা অনেকে তাঁর পাশে বসলেন। তারপর তিনি তাঁর মাথা নাড়তে লাগলেন বক্তার ন্যায়। তিনি বলেন, তারপর তিনি খুব কান্না করলেন।' ওমর (রা.) এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, 'আল্লাহর রাসুল, কী আপনাকে এত কাঁদাল?' নবীজি বললেন, 'এটি আমিনা বিনতে ওয়াহাবের কবর; আমি আমার প্রভুর নিকট তাঁর কবর জিয়ারতের অনুমতি চেয়েছিলাম; আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আমি তাঁর অনুকূলে ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চেয়েছিলাম; আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমাকে তাঁর প্রতি অনুকম্পা স্পর্শ করেছিল, তাই কেঁদেছি।' বর্ণনাকারী বলেন, 'ওই ঘণ্টার কান্নার মতো তাঁকে এত বেশি কাঁদতে আর কখনো দেখিনি।'
আবু হোরাইরা বলেন, 'নবীজি তাঁর মায়ের কবর জিয়ারত করে কেঁদে ফেললেন; তাঁর পাশে যাঁরা ছিলেন, তাঁরাও কাঁদলেন। পরে তিনি বললেন, "আমি মায়ের অনুকূলে ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চেয়েছিলাম; আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমি আমার প্রভুর নিকট তাঁর কবর জিয়ারতের জন্য অনুমতি চেয়েছিলাম; আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তোমরা কবরগুলো জিয়ারত করো, কারণ তা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়।"'
কিশোর জীবনের স্মৃতিবিজড়িত সেই আবওয়া পরবর্তী কালেও অনেক ঘটনার জন্য ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। এক. এখানে নবীজি (সা.) দ্বিতীয় হিজরির সফর মাসে সর্বপ্রথম গাজওয়া পরিচালনা করেন, যা গাজওয়া আবওয়া নামে পরিচিত। এ স্থানে তিনি ৭০ জন মুহাজিরকে নিয়ে কোরাইশ বাণিজ্য কাফেলাকে বাধা দিতে ১৫ দিন অবস্থান করেছিলেন। কিন্তু কোরাইশদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি। তবে এটি ছিল বনি জামরা গোত্রের এলাকা। তাদের সঙ্গে তিনি অনাক্রমণ চুক্তিতে আবদ্ধ হন।
দুই. এ স্থানে তিনি কিছু হাদিয়া গ্রহণ করেন। আবু রুহম আল-গিফারি থেকে বলেন, যখন নবীজি আবওয়ায় অবতরণ করলেন, তখন ইমা ইবনে রাহদাহ আল-গিফারি তাঁকে কিছু সবজি (মুলা) ও ৫০টি বকরি হাদিয়া দেন। তাঁর পুত্র জুফাফ ইবনে ইমা ইবনে রাহদাহকে আরও দুটি দুধেল উটসহ নবীজির নিকট পাঠান।
তিন. এ স্থানে কিছু হাদিয়া ত্যাগ করা হয়। সা'ব ইবনে জাসসামাহ আল-লাইসি (রা.) বলেন, 'আল-আবওয়া কিংবা ওয়াদ্দান নামক স্থানে অবস্থানকালে তিনি একটি বন্য গাধা নবীজির জন্য উপঢৌকন দিয়েছিলেন। সেটি তিনি গ্রহণ না করে বললেন, "আমরা ইহরাম অবস্থায় না থাকলে এটি ফেরত দিতাম না।"'
চার. এই আবওয়াতে 'রাত্রিকালীন আক্রমণে মুশরিকদের নারী ও শিশু নিহত হওয়া' প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে উল্লিখিত 'বাইয়াতান' শব্দগুলোর অর্থ সম্পর্কে নবীজিকে জিজ্ঞেস করা হয়। সা'ব ইবনে জাসসামা (রা.) বলেন, 'নবী (সা.) আবওয়া অথবা ওয়াদ্দান নামক স্থানে আমার কাছ দিয়ে পথ অতিক্রম করেন। তখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, যে মুশরিকদের সঙ্গে যুদ্ধ হচ্ছে, যদি রাত্রিকালীন আক্রমণে তাদের নারী ও শিশু নিহত হয়, তবে কী হবে?' নবীজি বলেন, 'তারাসহ তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।'
পাঁচ. এটি সেই স্থান, যেখানে আবু সুফিয়ান মক্কা বিজয়ের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। বস্তুত আবওয়ার সব স্মৃতি নবীমাতাকে ঘিরে। এখানে যেন ইতিহাসের ঘটনা একটিই—নবীজির কান্না, মায়ের জন্য কান্না, কিশোরকালের কান্না, পড়ন্তকালের কান্না। তিনি নিজে কাঁদেন, কাঁদেন সহস্র সঙ্গী, কাঁদে মুমিনদের চোখ। শুধু কাঁদে না কপটের বুক, হিংসুটের হৃদয়।
আবু সোলাইমান নবীজির কথা প্রসঙ্গে বলেন, কোরাইশরা যখন উহুদ যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বের হলো, তারা আবওয়ায় অবতরণ করে। হিন্দা বিনতে উতবা তাঁর স্বামী আবু সুফিয়ান ইবনে হারবকে বলেন, 'যদি তোমরা মুহাম্মদের মা আমিনার কবরটি খুঁড়ে ফেলতে পারতে! এটা তো আবওয়ায়।'
ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক : অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়